অগ্নিগর্ভ ভাটপাড়া, প্রশাসন সামাল দিতে ব্যর্থ

অগ্নিগর্ভ ভাটপাড়া (Photo: IANS)

তিনদিন ধরে চলছে বােমাবাজি, বাড়ি ভাঙচুর, লুঠপাট তবুও কাঁকিনাড়া-জগদ্দল এলাকায় হিংসা নিয়ে বন্ধ হচ্ছে না রাজনৈতিক দলগুলির তরজা। বরং দিনের পর দিন চলছে একে অপরকে দোষ দেওয়ার পালা। এরই মধ্যে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। কীভাবে আধাসেনা নামিয়ে ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও সমস্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা নিয়ে উঠতে শুরু করেছে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন।

সপ্তাহের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার সকালে যা আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যায়। এদিন দুষ্কৃতীদের হামলার মুখে পড়তে হল রেলযাত্রীদের। এদিন সকাল সাড়ে আটটার নৈহাটি লােকাল কাঁকিনাড়া স্টেশন ছেড়ে কিছুটা দুরে ২৯ নম্বর রেলগেটের আগে দাঁড়িয়ে পড়তেই লাইনের দু’পাশ থেকে দুষ্কৃতীরা ট্রেন লক্ষ্য করে বােমাবাজি শুরু করে। সঙ্গে অবিরাম ভাবে চলে পাথর ছােড়াছুড়ি। এরই মধ্যে নৈহাটি লােকালে উড়ে আসে একটি বােমা। তার আগেই প্রাণভয়ে যাত্রীরা ট্রেন থেকে লাফিয়ে নেমে পিছনের দিকে ছুটতে থাকে।

কাঁকিনাড়া স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ডাউন শান্তিপুর লােকালের যাত্রীরাও পরিমরি করে এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে। যার জেরে কমপক্ষে ১৮ জন যাত্রী পড়ে গিয়ে আহত হন। ততক্ষণে ২৯ নম্বর রেলগেটে অবরােধ শুরু হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ময়দানে নামে র‍্যাফ, কমব্যাট ফোর্স। রেলপুলিশ ঘটনাস্থলে আসলেও তাদের ওপর চলে ইটবৃষ্টি। কাঁকিনাড়া স্টেশন চত্বর রণক্ষেত্রের ছবি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে পুলিশকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমসিম খেতে হয়। শেষে তিন ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু হয়।


প্রসঙ্গত, সােমবার বিকেলের পর থেকে ভাটপাড়ার পরিস্থিতি ঠিক থাকলেও রাতে আবারও বেশ কিছু জায়গায় অশান্তি ছড়ায়। ভাটপাড়া পুরসভার ১৩ নং ওয়ার্ডে আর্যসমাজ এলাকায় অ্যাংলাে ইন্ডিয়ান জুটমিলের কর্মী আহমেদ হুসেনের বাড়িতে লুঠপাট চালায় একদল দুষ্কৃতী। তার অভিযােগ, ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে আলমারিতে থাকা নগদ টাকা ও গহনা মিলিয়ে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা দুষ্কৃতীরা নিয়ে যায়। প্রাণভয়ে তিনি বৃদ্ধা মা, মেয়ে, স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে হাওড়ায় আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। আহমেদ সাহেব তার একমাত্র কন্যা সাবা নিগার কাঁকিনাড়া উর্দু হাইস্কুল থেকে মঙ্গলবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশের খবর জানান। ওই আর্যসমাজ এলাকায় একই রাতে প্রমােদ সাউয়ের বাড়িতে ভাঙচুর, লুঠপাট চালিয়েছে দুষ্কৃতীরা। অভিযােগ, আলমারি ভেঙে টাকা, গহনা নিয়ে গিয়েছে।

জগদ্দল থানার কাঁকিনাড়ার কাঁটাডাঙা, ৫ নং সাইডিং, নয়াবাজার আর্যসমাজ, সাহুসমাজ, বারুইপাড়া, টিনার গুদাম, রুস্তম গুমটি এই এলাকাগুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন। রাজনৈতিক হিংসা ছড়াচ্ছে অঞ্চলগুলিতে। এলাকার কাউন্সিলর থেকে শাসক দলের নেতৃত্ব কারও দেখা মিলছে না। আর এর মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলি একে অপরকে দোষারােপের কাজে নেমে পড়েছেন। এদিন জেলা তৃণমূলের পক্ষ থেকে সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, ভাটপাড়া উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী। মদন মিত্র, জেলার কার্যকরী সভাপতি নারায়ণ গােস্বামী, কর্মাধ্যক্ষ এ কে এম ফারহাদ, জেলার যুব নেতা পার্থ ভৌমিক, ঝন্টু দে, পুরপ্রধান সুনীল মুখার্জি সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ জেলাশাসকের কাছ ভাটপাড়ায় চলমান রাজনৈতিক হিংসা রােধে ডেপুটেশন জমা দেন।

এরপরই ভাটপাড়ার পরিস্থিতি নিয়ে রীতিমতাে হুঙ্কার ছাড়েন তৃণমূল জেলা সভাপতি। তিনি জানান, মাত্র ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম। আর এর মধ্যে এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অর্জুন সিংকে গ্রেফতার করা না হলে শুরু হয়ে যাবে ‘ভাটপাড়া চলাে’ অভিযান। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে অর্জুন সিং ও তার দলবল স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের ওপর ব্যাপক অত্যাচার আরম্ভ করেছে। জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের গাড়ি বাড়ি। এরই মধ্যে কয়েকশাে তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে অগ্নি সংযােগের ঘটনা ঘটেছে বলে তৃণমুল নেতৃত্বের দাবি। এমনকি কেন্দ্রীয় বাহিনীর টিয়ার গ্যাসের শেলও ব্যবহার করা হচ্ছে এই হামলায় বলে অভিযােগ।

এ বিষয়ে অভিযােগ জানাতে এসে তৃণমূল নেতৃত্ব দাবি করেন, এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে অবিলম্বে অর্জন সিংকে গ্রেফতার করতে হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষ নিজেরাই এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে। এ প্রসঙ্গে প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রী মদন মিত্রের দাবি, ভাটপাড়ার চালতা রােড, কাঁকিনাড়া, সম্মিলনী ক্লাব, জুট মিল লাইন সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বহিরাগত মুসলিমদের নিয়ে হামলা চালাচ্ছে অর্জুন সিংয়ের বাহিনী। ফলে আতঙ্কে ঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন ওই এলাকার মানুষজন। একই সেহগ নরেশ, বিনােদ, অরুণ, তরুণ, ভাড়ুয়াদের একটি দল অর্জুনের নির্দেশে রুস্তামগুটি, বারুইপাড়া, মমিনপাড়া সহ বিভিন্ন এলাকা। তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের ওপর যথেচ্ছ হামলা চালাচ্ছে বলে তার অভিযােগ।

এবিষয়ে জেলা সভাপতি তথা রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, অর্জুন সিং নিজেকে কি ভাবছে জানি না। কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তায় থেকেও এসব করছে। কিন্তু কোনওরকমেই ওকে ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি এবিষয়ে বিজেপিও ছাড় পাবে না বলে সাফ জানান জ্যোতিপ্রিয়। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, এবারের নির্বাচনে অর্জুন ও তার পুত্র পবন দু জনেই হারবে। আর ৮ তারিখের পর অর্জুন সিং এবং বিজেপি কেউই ছাড়া পাবে না বলে হুঁশিয়ারি তাঁর। অবশ্য বিজেপি প্রার্থী অর্জুন সিং তৃণমূলকেই দায়ী করেছেন। তাঁর দাবি, মদন মিত্র বাইরে থেকে লােক ঢুকিয়ে ভােটের আগেই ঝামেলা পাকিয়েছে। পুলিশ সব জেনেও চুপ থেকেছে। এই পুলিশ কমিশনার তৃণমূলের হয়ে কাজ করছে। এব্যাপারে কমিশনে একাধিকবার অভিযােগ জানানাে হয়েছে। এবিষয়ে স্থানীয় সিপিএম নেত্রী গার্গী চ্যাটার্জি ও সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী সরাসরি তৃণমূল-বিজেপিকে দায়ী করে।