সংসদে পেশ হওয়া কেন্দ্রীয় বাজেট দিশাহীন ও ধাপ্পাবাজি বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন রাজ্যের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অমিত মিত্র। রবিবার নবান্নে বাজেট পরবর্তী সাংবাদিক বৈঠকে তিনি জানান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়নে এই বাজেট কোনো ইতিবাচক ভূমিকা নেবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, বরাদ্দ কমিয়ে সাধারণ মানুষকে আরও সঙ্কটে ফেলবে এই বাজেট।
অমিত মিত্র বলেন, ‘বাজেট মানে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি সরকারের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু মোদী সরকার সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ। বাজেটের অনুমান এবং বাস্তব খরচের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। গত কয়েক বছরের প্রবণতাই দেখায়, যা ঘোষণা করা হয়, বছর শেষে তার চেয়ে অনেক কম খরচ হয়। একে আমি ধাপ্পাবাজি বলছি।’
শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে অমিত মিত্র বলেন, ২০১৫-১৬ সালে কেন্দ্রীয় বাজেটের মোট ব্যয়ের ৩.৮ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকলেও ২০২৪-২৫ সালে তা কমে ২.৬০ শতাংশে নেমেছে। কোঠারি কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়ার কথা থাকলেও বরাদ্দ কমানো হয়েছে। তাঁর মতে, এর ফলে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
কৃষিক্ষেত্রে বরাদ্দ কমানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন অমিত মিত্র। সারের ভর্তুকি কমানোয় কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে। ২০১৫-১৬ সালে মোট ব্যয়ের প্রায় ৪ শতাংশ সারের ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া হলেও বর্তমানে তা কমে হয়েছে ৩.১৯ শতাংশ।
তফশিলি জাতি , উপজাতি , ওবিসি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কল্যাণেও বরাদ্দ কমানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আগে যেখানে মোট বাজেটের ০.২১ শতাংশ বরাদ্দ থাকত, এবার তা কমে ০.১৯ শতাংশ হয়েছে। শতাংশের বিচারে ফারাক সামান্য হলেও প্রকৃত অর্থে হাজার হাজার কোটি টাকার এই ঘাটতি সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের জন্য বড় ধাক্কা।
অমিত মিত্র প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (শহরাঞ্চল) ও গ্রামীণ আবাস যোজনা এবং স্বচ্ছ ভারত মিশনের বাস্তব খরচের উদাহরণও তুলে ধরেন। তিনি জানান, আবাস যোজনা (শহরাঞ্চল)-এর জন্য ২০২৪-২৫ সালে বাজেট বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা, বাস্তবে খরচ হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা।
গ্রামীণ আবাস যোজনাতেও বরাদ্দ ৫৪ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ৩২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। স্বচ্ছ ভারত মিশনের ক্ষেত্রে বরাদ্দ ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে বাস্তবে হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৮০০ কোটি। বাজেটে বড় অঙ্ক দেখিয়ে হাততালি কুড়োনোর চেষ্টা হলেও দিনের শেষে সাধারণ মানুষের হাতে কিছুই পৌঁছাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অমিত মিত্র। তিনি বলেন, বিদেশি লগ্নিকারীরা ভারতের বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। শুধু আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে ৪.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে অমিত মিত্রের বক্তব্য, এই বাজেট সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষার জন্য নয়, এটি শুধুই পরিসংখ্যানের খেলা, যা দেশের প্রকৃত উন্নয়নকে স্তব্ধ করে দেবে।