২০২৩ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছিল। সেই সময়ে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অধিকাংশ গ্রাম পঞ্চায়েতের ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। ২০২৬ সালে এসে রাজ্য সরকারের পরিবর্তনের পর থেকে একে একে গ্রাম পঞ্চায়েত হাতছাড়া হচ্ছে তৃণমূলের। ২০২৩ সালে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর-১ নম্বর ব্লকের অন্তর্গত অমর্ষি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের ১৮টি আসনের মধ্যে তৃণমূল পায় ১৩টি এবং বিজেপি পায় ৫টি। ক্ষমতায় আসীন হন তৃণমূল।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের পাশাপাশি পূর্ব মেদিনীপুরেও ভরাডুবি হয়। গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি অচল অবস্থায় পরিণত হয়। একে একে প্রধান, উপপ্রধান-সহ সদস্যরা পদত্যাগ করেন। এই গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান, উপপ্রধান-সহ ১০ জন প্রদত্যাগ করেন। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচিত পঞ্চায়েত সদস্য-সদস্যাদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন গ্রাম পঞ্চায়েত বোর্ড গঠন করা হয় সোমবার। পঞ্চায়েতের প্রচলিত আইন ও নিয়ম মেনেই পটাশপুর-১ ব্লকের বিডিও মহম্মদ করিমুল ইসলামের উপস্থিতিতে এই বোর্ড গঠন সম্পন্ন হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে অমর্ষি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতে তৃণমূল কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বোর্ড গঠন করেছিল। সেই সময় প্রধান, উপপ্রধান-সহ মোট ১১ জন তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য-সদস্যা পঞ্চায়েত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই পঞ্চায়েতে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান, উপপ্রধান এবং অন্যান্য সদস্য-সদস্যারা গ্রাম পঞ্চায়েতে আসা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেন। প্রায় আড়াই মাস ধরে তাঁরা পঞ্চায়েতের কোনও প্রশাসনিক বা উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে তাঁরা একযোগে নিজেদের পদ থেকে পদত্যাগ করেন বলে জানা যায়। এর ফলে গ্রাম পঞ্চায়েত কার্যত প্রশাসনিকভাবে অচল হয়ে পড়ে।
বিজেপির অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবেই গ্রাম পঞ্চায়েতের উন্নয়নমূলক কাজকর্ম ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এর জেরে সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক পরিষেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জন্ম-মৃত্যু শংসাপত্র, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের নথিপত্র, আবাস যোজনা, পানীয় জল, রাস্তা, নিকাশি এবং অন্যান্য জনপরিষেবার কাজে বিলম্ব দেখা দেয়। বহু সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন পঞ্চায়েতে গিয়েও পরিষেবা না পেয়ে ফিরে আসতে হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে পঞ্চায়েত আইন অনুযায়ী নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পটাশপুর-১ ব্লক প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এবং বিডিও মহম্মদ করিমুল ইসলামের উপস্থিতিতে ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়। সমস্ত আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নতুন বোর্ডের দায়িত্বভার গ্রহণ করা হয়।
নবগঠিত বোর্ডে শেফালী কর গ্রাম পঞ্চায়েতের নতুন প্রধান এবং শচীন্দ্রনাথ গিরি উপপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন। বোর্ড গঠনের পর উপস্থিত বিজেপি নেতা-কর্মী, সমর্থক এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নবনির্বাচিত প্রধান ও উপপ্রধানকে ফুলের তোড়া ও উত্তরীয় পরিয়ে সংবর্ধনা জানান। এর পাশাপাশি, পঞ্চায়েতের অন্যান্য সদস্য-সদস্যাদেরও শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়।
নবনির্বাচিত প্রধান শেফালী কর বলেন, ‘গ্রামবাসীর আস্থা ও বিশ্বাসকে মর্যাদা দিয়ে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং উন্নয়নমুখী প্রশাসন গড়ে তোলাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।’ দীর্ঘদিন ধরে যে উন্নয়নমূলক কাজগুলি আটকে ছিল, সেগুলি দ্রুত শুরু করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা হবে বলে তিনি জানান।
উপপ্রধান শচীন্দ্রনাথ গিরিও জানান, রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে এলাকার প্রতিটি মানুষের স্বার্থে কাজ করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রেখে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন তিনি। তবে স্থানীয় বিজেপি নেতা তাপস মাজির দাবি, নতুন বোর্ড গঠনের মাধ্যমে অমর্ষি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অচলাবস্থার অবসান ঘটল। এখন থেকে উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির কাজ দ্রুত এগিয়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষ নিয়মিতভাবে সমস্ত সরকারি পরিষেবা পাবেন। এলাকার সার্বিক উন্নয়ন, পরিকাঠামো নির্মাণ, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং জনস্বার্থে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে অমর্ষি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতকে একটি আদর্শ পঞ্চায়েত হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই নতুন বোর্ড কাজ শুরু করেছে বলে বিজেপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।