আজ রথযাত্রা। বাঙালির ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে রয়েছে রথযাত্রা। ‘রথ দেখা কলা বেচা’ এই প্রবাদ তো বাঙালির জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। রথের মেলা পাপড়-জিলিপি খাওয়া এর অপেক্ষায় থাকে ছোট থেকে বড় সব বয়সের বাঙালিই। রথের দিন থেকেই দুর্গাপুজোর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে যায়। এই দিন অনেকেই খুঁটি পুজো করে থাকেন।
দুর্গামুর্তির বায়না নেওয়াও রথের দিন থেকেই শুরু হয়ে যায়। তবে রথের নাম উঠলে প্রথমেই মাথায় আসে ওড়িশার পুরীর রথযাত্রার কথা। পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহ্যের নিরিখে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রথযাত্রা হল মাহেশের রথযাত্রা। প্রায় ৬২৫ বছরের প্রাচীন এই রথযাত্রার উল্লেখ রয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাধারানি উপন্যাসেও।
বর্তমানে মাহেশে যে রথ টানা হয়, সেটি চারতলা বিশিষ্ট লোহার রথ। প্রায় ৫০ ফুট উঁচু এই রথে রয়েছে ১২টি লোহার চাকা। প্রথম তলায় চৈতন্যলীলা, দ্বিতীয় তলায় কৃষ্ণলীলী এবং তৃতীয় তলায় রামলীলার চিত্র অঙ্কিত রয়েছে। চতুর্থ তলায় প্রতিষ্ঠা করা হয় বিগ্রহ। রথের সামনে জোড়া তামার ঘোড়া এবং কাঠের তৈরি সারথিও থাকে।
তবে শুধু মাহেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতেই বহু প্রাচীন রথযাত্রার ঐতিহ্য রয়েছে। কোথাও রথে আসীন হন রঘুনাথ, কোথাও মদনমোহন, আবার কোথাও রথযাত্রাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শতাব্দীপ্রাচীন বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান।
নদিয়ার শান্তিপুরে রাস, ঝুলন কিংবা জন্মাষ্টমীর মতোই রথযাত্রার ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন। এখানকার বিশেষত্ব হল, রথে মূল আকর্ষণ জগন্নাথ নন। বরং গোস্বামী বাড়িগুলির আরাধ্য দেবতা রঘুনাথ। রামচন্দ্রের দারুমূর্তি হিসেবে পূজিত এই বিগ্রহ ধুতি পরিহিত অবস্থায় পদ্মাসনে আসীন থাকেন। তাঁর গায়ের রং সবুজ এবং পাশে থাকা জগন্নাথের বিগ্রহ।
প্রায় আড়াইশো বছরেরও বেশি পুরনো বড়গোস্বামী বাড়ির রথযাত্রায় প্রথমদিকে জগন্নাথের পাশাপাশি রঘুনাথের কাঠের বিগ্রহও রথে তোলা হতো। সময়ের সঙ্গে রঘুনাথই হয়ে ওঠেন এই রথযাত্রার প্রধান আকর্ষণ। রথ উপলক্ষে নানা ধরনের ভোগ নিবেদন করা হয়। উল্টোরথের আগেন দিন আষাঢ় নবমীর রাতে হয় ‘দেওড়াভোগ’। এই ভোগে কলমিশাক, সাদা ভাত, খিচুড়ি, নিরামিষ তরকারি, ভাজা, দই ও পায়েস-সহ একাধিক পদ থাকে। রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে শান্তিপুরে দুটি বড় মেলা বসে। একটি বড়গোস্বামী বাড়ি সংলগ্ন মাঠে এবং অন্যটি রথতলায়।
কোচবিহার রথযাত্রা্ হয় মদনমোহনকে কেন্দ্র করে। ১৮৯০ সালে এই রথযাত্রার সূচনা হয়। রথযাত্রার আগের দিন পালিত হয় অধিবাস। সুগন্ধি তেল দিয়ে হয় মদনমোহনের অঙ্গরাগ। পরদিন মহাস্নানের পর রথযাত্রার দিন মূল মন্দিরের পশ্চিম দিকের অন্য একটি মন্দির স্থানান্তরিত করা হয় বিগ্রহকে।
২২ ফুট উঁচু এই রথে রয়েছে ছয়টি চাকা। সামনে থাকে দু’টি রুপোর ঘোড়া এবং কাঠের তৈরি সারথি। প্রতি বছর মন্দিরেই ৪০ কেজি পাট দিয়ে তৈরি হয় রথের রশি। রথে চড়ে মদনমোহন শহর পরিক্রমা করে সাত দিনের জন্য যান মাসির বাড়ি ‘গুঞ্জবাড়ি’-তে। উল্টোরথের পর মন্দিরে ফিরে তাঁকে কিছু সময়ের জন্য বারান্দায় রাখা হয়। এই রীতির নাম ‘ঠাকুরের হাওয়া খাওয়া’। সেই সময় বিশেষ ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় শুধুমাত্র রসগোল্লা। এরপরই তিনি পুনরায় সিংহাসনে আসীন হন।
হুগলির বলাগড় থানা এলাকার গুপ্তিপাড়ার রথ ‘বৃন্দাবন জিউ’-র রথ নামে পরিচিত। বর্ধমান জেলার সীমানা সংলগ্ন এই জনপদের রথযাত্রার ইতিহাস প্রায় ২৮৫ বছরের পুরনো। এখানে টানা হয় নয় চূড়াবিশিষ্ট রথ। প্রতিটি চূড়ায় উড়তে থাকে রঙিন ধ্বজা। বৃন্দাবন মন্দির থেক জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গোসাইগঞ্জ-বড়বাজারে মাসি বাড়িতে যান।
গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় রীতি হল ভাণ্ডার লুট। উল্টোরথের দিন মাসির বাড়ির মন্দিরের তিনটি দরজা একসঙ্গে খুলে দেওয়া হয়। ভিতরে মালসাভর্তি থাকে ৫২ পদের নানা খাবার। পুণ্যার্থীরা হুড়োহুড়ি করে সেই প্রদাস সংগ্রহ করেন। এই শতাব্দীপ্রাচীন রীতিই গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।