ব্রিগেডের বৃত্তে উত্থান-পতনের রাজনীতি, ১৫ বছর পর শুভেন্দুর অভিষেক

২০১১ সালের ২১ জুলাই। সেবার তৃণমূলের শহিদ দিবসের সমাবেশ ব্রিগেডে। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে সদ্য বাংলার ক্ষমতায় এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস। একুশে জুলাইকে তিনি কার্যত ‘বিজয় দিবস’-এর রূপ দেন। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সেই বিজয়ের মঞ্চেই নাকি ভবিষ্যতের সংঘাতের বীজ রোপিত হয়েছিল— যার পরিণতি দেখা গেল ১৫ বছর পরে, একই ব্রিগেডে শুভেন্দু অধিকারীর উত্থানের মধ্য দিয়ে।

সেই ২০১১ সালের ব্রিগেড সমাবেশ থেকেই মমতা ঘোষণা করেছিলেন নতুন সংগঠন ‘তৃণমূল যুবা’-র। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলের যুব সংগঠন থাকা সত্ত্বেও আলাদা করে এই সংগঠন গড়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সক্রিয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা। কারণ তখনও পর্যন্ত অভিষেকের পরিচয় মূলত মমতার ভাইপো হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল। ‘যুবা’-র প্রধান হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণার পর থেকেই দলের অন্দরে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে শুরু করে।

এই পর্বেই সামনে আসে মমতা ও শুভেন্দুর দূরত্বের ইঙ্গিত। ব্রিগেড সমাবেশের কিছুদিন পরেই যুব তৃণমূলের সভাপতির পদ থেকে শুভেন্দু অধিকারীকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব পান সৌমিত্র খাঁ। দলের অন্দরে তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে— বিদ্যমান যুব সংগঠন থাকা সত্ত্বেও নতুন সংগঠনের প্রয়োজন কেন? অনেকের ধারণা ছিল, শুভেন্দুর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতেই অভিষেককে সামনে আনার কৌশল নেওয়া হয়েছিল। পরে যুব সংগঠনের উপরেও অভিষেকের প্রভাব বাড়তে থাকে।

এরপর ২০১৪ সালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রে প্রার্থী করা হয়। সেই সময় আসনটি তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত ছিল। অন্যদিকে, শুভেন্দু অধিকারী জিতে আসেন তুলনামূলক কঠিন তমলুক কেন্দ্র থেকে। কিন্তু দু’বছরের মধ্যেই তাঁকে জাতীয় রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাজ্য মন্ত্রিসভায় আনা হয়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, দিল্লির রাজনীতিতে অভিষেককে আরও বেশি জায়গা করে দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুভেন্দু ও মমতার দূরত্ব বাড়তেই থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু। তারপর থেকেই তিনি বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূল বিরোধিতার প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। দীর্ঘ আন্দোলন, সংগঠন বিস্তার এবং হিন্দুত্বের রাজনীতিকে সামনে রেখে লড়াই চালিয়ে যান তিনি।

আর আজ, সেই শুভেন্দুরই রাজনৈতিক অভিষেক ঘটল ব্রিগেডের মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। যে ব্রিগেডে ১৫ বছর আগে অভিষেকের উত্থানের সূচনা হয়েছিল, সেই মঞ্চই শনিবার হয়ে উঠল শুভেন্দুর উত্থানের প্রতীক। বাংলার রাজনীতিতে এ যেন ইতিহাসের এক আশ্চর্য বৃত্তপূরণ।