পাহাড়ের শেষ কথা বিমলই: জিটিএ-র ব্যর্থতা ঝেড়ে প্রত্যাবর্তনের নয়া আখ্যান ‘কিং মেকার’ গুরুং-র

২০১৭ সালের অগ্নিগর্ভ পাহাড় থেকে ছাব্বিশের নির্বাচনী ময়দান— দীর্ঘ লড়াই, নির্বাসন আর প্রত্যাবর্তনের বৃত্ত সম্পূর্ণ করলেন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সুপ্রিমো বিমল গুরুং। একসময় রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি দিলেও, বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরতেই দেখা গেল, পাহাড়ের ‘সিংহাসন’ হারানো তো দুরস্ত, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে ‘কিং মেকার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন তিনি। সুবাস ঘিসিং-পরবর্তী যুগে পাহাড়ের রাশ যে এখনও তাঁরই হাতে বন্দি, চারটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিজেপির জয়জয়কারে তা আরও একবার প্রমাণ করল।

সালটা ২০২২। গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জিটিএ  নির্বাচনে বিমল গুরুংয়ের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। ৪৫টি আসনের মধ্যে লড়াই করে তাঁর দল হাতে গোনা কয়েকটি আসনে জয়লাভ করেছিল। মিলেছিল মাত্র চারটে আসন। এমনকী বিমল গুরুংয়ের খাসতালুক সিংমারি-পাতলেবাস এলাকাতেও তাঁর সমর্থিত প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছিলেন। সেই সময় অনীত থাপার ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা (বিজিপিএম) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বোর্ড গঠন করলে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে ‘গুরুং-যুগ’ শেষ হতে চলেছে।

কিন্তু গত জিটিএ নির্বাচনে অনীত থাপার কাছে পাহাড়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ খোয়ানোর পর, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ফের রাজনৈতিক জয় ছিনিয়ে নেওয়া গুরুংয়ের জন্য ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বিশ্লেষকদের মতে, জিটিএ-তে হারের পর গুরুং নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে জনসংযোগ বাড়ান এবং বিজেপির সঙ্গে জোটকে পাহাড়ের মানুষের কাছে একমাত্র বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেন।


বিমল গুরুংয়ের কৌশল ছিল স্পষ্ট। তৃণমূল কংগ্রেস এবং পাহাড়ের তৎকালীন শাসকদল অনীত থাপার বিরোধিতাকে হাতিয়ার করে গোর্খা ভোটকে এক ছাতার তলায় আনা। পাহাড়ের অন্দরে জিএনএলএফ ও বিজিপিএম-এর প্রভাব খাটিয়ে এককভাবে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার শক্তিকে বিজেপির অনুকূলে ব্যবহার করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।

দার্জিলিং, কার্শিয়াং ও কালিম্পংয়ে বিজেপি প্রার্থীদের জয়ের পিছনে গুরুংয়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং পাহাড়ের আবেগ কাজ করেছে। ডুয়ার্সের মাদারিহাট আসনে লক্ষ্মণ লিম্বুর জয় প্রমাণ করেছে যে সমতলের গোর্খা ভোটব্যাঙ্কেও গুরুংয়ের প্রভাব অপরিবর্তিত। একসময় রাজনীতি ছাড়ার কথা বললেও ছাব্বিশের বিধানসভার জয় তাঁর প্রাসঙ্গিকতা আরও বাড়িয়ে দিল। জিটিএ নির্বাচনে হারের পর বিধানসভায় রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটল তাঁর। এই সাফল্যের পর পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান (পিপিএস) এবং কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের দাবি আরও জোরালো হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিমল গুরুংয়ের এই সাফল্য রাজ্য রাজনীতির মূল স্রোতে পাহাড়ের সমস্যাগুলোকে নতুন করে গুরুত্ব দেবে। সন্ন্যাস নেওয়ার যে চ্যালেঞ্জ তিনি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, শেষ হাসি হেসে তিনি প্রমাণ করলেন যে পাহাড়ের ভাগ্যবিধাতা হিসেবে তাঁর নাম এখনও সবার উপরে। রাজু বিস্তার হয়ে প্রচার চালিয়ে যে গতি তিনি লোকসভায় দিয়েছিলেন, বিধানসভাতেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে দিল্লিকে গুরুং বার্তা দিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। পাহাড়ের দাবি আদায়ে তিনি এখন আরও বেশি আপসহীন। পাহাড়ের রাজনীতিতে এখন একটাই চর্চার বিষয়, জিটিএ-র সাময়িক ব্যর্থতা কাটিয়ে বিমল গুরুং ফিরলেন রাজার মেজাজে।

বিমল গুরুং বলেন, ‘আমি বলেছিলাম আমি হারিয়ে যাইনি। পাহাড়বাসী এখনও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার উপরই ভরসা রাখছে। কারণ তারা জানে একমাত্র আমরাই পাহাড়বাসীর দাবি আদায় করতে পারব। আর সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এই জয় আমাদের দাবি আদায়ে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।‘