মানবতার অনন্ত প্রতিধ্বনি শোনা যায় নজরুলের সুরে-ছন্দে

১১ জ্যৈষ্ঠ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন। নজরুল ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তাঁর লেখনী বাংলার বিপ্লবীদের যেমন উজ্জীবিত করেছিল, তেমনই মনে অপার শান্তি এনে দিয়েছিল সাধারণ গৃহী মানুষের হৃদয়ে। নজরুল শুধুমাত্র একজন বিদ্রোহী কবি ননতিনি ছিলেন এক অসামান্য সুরকারগীতিকার ও সংগীতস্রষ্টা। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গান যা নজরুলগীতি’ নামে পরিচিত আজও বাঙালির আবেগসংস্কৃতি ও চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রেমসাম্যভক্তিবিদ্রোহমানবতা ও প্রকৃতির অনুপম মেলবন্ধন ঘটেছে তাঁর গানে। বাংলা গানের ভাণ্ডারকে তিনি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেনযা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

নজরুলের সংগীতজীবনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর বহুমাত্রিকতা। বাংলা গানে তিনি যেমন ইসলামি সংগীতকে নতুন মর্যাদা দিয়েছেনতেমনই শ্যামাসংগীতকীর্তনভক্তিগীতিপ্রেমের গান কিংবা দেশাত্মবোধক সংগীতেও রেখে গিয়েছেন অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর। বাংলা গজলের পথিকৃৎ হিসেবেও তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। উর্দু ও ফারসি গানের ধারা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বাংলা ভাষায় গজলের এক নতুন জগৎ নির্মাণ করেছিলেন।

ইসলামি সংগীতে নজরুলের অবদান বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। হামদনাতগজল ও রমজানের গানকে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। শুধু মুসলিম সম্প্রদায় নয়, তাঁর ইসলামি গানে মুগ্ধ প্রতিটি সাধারণ মানুষ। নজরুলের লেখা রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ইদ’ গানটি আজ পবিত্র ইদ উৎসবের আবহের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ধর্মীয় আবেগকে তিনি শুধু আচার বা উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং মানবতা ও সম্প্রীতির বার্তায় তাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। তাঁর ইসলামি সংগীত তাই কেবল ধর্মীয় নয়সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ।


অন্যদিকে শ্যামাসংগীত ও ভক্তিমূলক গানেও নজরুল ছিলেন সমান সাবলীল। মা কালীর উদ্দেশে লেখা তাঁর গানগুলি বাংলা ভক্তিগীতিকে নতুন মাত্রা দেয়। তাঁর লেখা শ্মশানে জাগিছে শ্যামা মা অন্তিমে সন্তানে নিতে কোলে জননী শান্তিময়ী বসিয়া আছে ওই চিতার আগুন ঢেকে স্নেহ আঁচলে আজও শিহরণ জাগায়। তাঁর লেখা গানে ইসলামি ও হিন্দু ধর্মীয় চেতনার এমন অসাম্প্রদায়িক সমন্বয় নজরুলের মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। কবির বিশ্বাস ছিলধর্ম মানুষের বিভেদের নয়মিলনের পথ। সেটাই ধরা পড়েছে তাঁর লেখা একের পর এক গানে। আবার নজরুলের লেটো গানে উঠে এসেছে গ্রাম-বাংলার মানুষের জীবন কথা।

প্রেমের গানেও নজরুল ছিলেন ব্যতিক্রমী। তাঁর গানে প্রেম কখনও আকুল অপেক্ষাকখনও বিরহের যন্ত্রণাকখনও বা উচ্ছ্বাসের রঙে ধরা দিয়েছে। নারী-পুরুষের আবেগকে তিনি অত্যন্ত কোমল অথচ শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন। তাই তিনি লিখেছেন, মিটিল না সাধ ভাল বাসিয়া তোমায়, বাসিতে ভাল পুনঃ আসিব ধরায়। একই সঙ্গে প্রকৃতিনির্ভর গানেও তিনি বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যকে জীবন্ত করে তুলেছেন। বসন্তবর্ষা বা শরৎপ্রতিটি ঋতুই তাঁর গানে নতুন সুর ও অনুভূতি ও আঙ্গিকে প্রকাশ পেয়েছে।

নজরুলের দেশাত্মবোধক গান বাঙালির সংগ্রামী চেতনাকে জাগিয়ে তুলেছিল। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর গান ছিল প্রতিবাদ ও সাহসের ভাষা। কারার ঐ লৌহ কপাট’ কিংবা চল চল চল’ শুধু গান নয় আন্দোলনের আহ্বান হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়েও তাঁর দেশাত্মবোধক গান মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রেরণা জুগিয়েছে।

সংগীত বিশেষজ্ঞদের মতেনজরুল তাঁর বাংলা গানে রাগসংগীতলোকসংগীত ও পাশ্চাত্য সুরের এক অভিনব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর প্রায় চার হাজার গানের প্রতিটিতেই রয়েছে ভাষার সৌন্দর্যসুরের বৈচিত্র্য এবং গভীর মানবিক আবেদন। তাই সময় বদলালেও নজরুলগীতির আবেদন কখনও ম্লান হয়নি। বর্তমান প্রজন্মের কাছেও নজরুল সমান প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রদায়িক বিভাজনহিংসা ও অসহিষ্ণুতার সময়ে তাঁর গান  মানুষকে প্রেমসাম্য ও মানবতার পাঠ শেখায়। নজরুলের জন্মদিন তাই শুধু একজন কবির জন্মস্মরণ নয়, এটি বাংলা সংস্কৃতিঅসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মুক্ত মানবতার এক মহাউদযাপন।