শেষ হয়ে গেল একটি বছর। আগামীকাল পয়লা বৈশাখ। একটি নতুন বছরের শুরু। ১৪৩২ বঙ্গাব্দকে বিদায় জানিয়ে স্বাগত করা হবে ১৪৩৩-কে। হালখাতার পুজো, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার মধ্যে দিয়ে বছরের প্রথম দিনটি উদযাপন করবে আপামর বাঙালি। কলেজস্ট্রিট বইপাড়া নতুন বইয়ের গন্ধের সঙ্গে সেজে ওঠবে পয়লা বৈশাখের সাজে।
নববর্ষের চার-পাঁচ আগে থেকেই দোকানে দোকানে শুরু হয়ে যায় ঝাড়পোঁছ। চাঁদমালা, ফুলে সেজে উঠতে থাকে চারপাশ। তার পর আসে নতুন বছর। আর নতুন ক্যালেন্ডার, প্যারামাউন্টের ডাব শরবত, পুঁটিরামের সন্দেশের সঙ্গে কী মসৃণভাবেই মিলেমিশে যেতে থাকে সাহিত্য।
বিভিন্ন প্রকাশকের দপ্তরে দপ্তরে হবে হালখাতার পুজো। লাল মোড়ক জড়ানো খাতায় সিঁদুর ছুঁয়ে শুরু হবে একটি নতুন বছর। লেখক, পাঠক এবং শিল্পীরা প্রকাশকের আমন্ত্রণে তাঁদের দপ্তরে আসবেন। সারাদিন গান, কবিতা এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে চলবে জমজমাট আড্ডা। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে অনেক প্রকাশ নতুন বইও প্রকাশ করেন। প্রকাশকের তরফে লেখকের হাতে তুলে দেওয়া হয় বকেয়া অর্থ।
সারাদিন গমগম করে বইপাড়ার অলিগলি। সর্বত্র ধরা পড়ে উৎসবের মেজাজ। বৈশাখ সবাইকে একসুতোয় বেঁধে দেয় নতুন করে।রোদ ঝলমলে বইপাড়ার অলিতে গলিতে যুবক-যুবতীর ভিড় উপচে পড়বে। কফিহাউসের দোতলা-তিনতলায় বসবে জমাটি আড্ডা।
তবে নববর্ষের এই সুরেলা সুরের ছন্দপতন ঘটে। কোথাও কোথাও বেজে ওঠে বেদনার সুর। লাল মলাটে মোড়া জাবেদা আর খতিয়ান খাতার সারি স্তূপাকারে সাজানো থাকে। আসে না কোনও ক্রেতা। অপলক চোখে তাকিয়ে থাকতে হয় ক্রেতার আশায়। মহম্মদ আবির এরকমই একজন বিক্রেতা। ক্রেতার দেখা নেই। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। তাঁর মুখে শোনা যায়, ‘বাপ-ঠাকুরদার আমলের ব্যবসা। লাভ না হলেও বন্ধ করতে মন চায় না।‘
বিহারের মুজফ্ফরপুর জেলার বহরমপুরা গ্রামের বাসিন্দা মহম্মদ আবির। বয়স ৬৭ বছর। আবির প্রথম বাবার সঙ্গে ২৫ বছর বয়সে জলপাইগুড়িতে এসেছিলেন। তারপর থেকে প্রতি বছর পয়লা বৈশাখের সময় তিনি নিয়ম করে এখানে আসেন।
বছরের বাকি সময় বিহারে বিভিন্ন অফিসে বাইন্ডিংয়ের কাজ করে সংসার চালান। পয়লা বৈশাখের আগে দু’মাসের জন্য জলপাইগুড়ির সমাজপাড়া মোড় থেকে মার্চেন্ট রোডের জোড়াবাতি মোড় পর্যন্ত ফুটপাথই হয়ে ওঠে তাঁর হালখাতার দোকান। কিন্তু সময় বদলেছে। কম্পিউটার আর ডিজিটাল হিসাবনিকাশের দাপটে বহু আগেই কমে গিয়েছে হালখাতার প্রচলন। তার প্রভাব পড়েছে আবিরের ব্যবসাতেও।
তবুও হাল ছাড়তে রাজি নন তিনি। এখনও কিছু পুরনো গ্রাহক আছেন, যাঁরা নিয়ম করে তাঁর কাছ থেকে জাবেদা খাতা কেনেন। তাঁদের জন্যই বছরের পর বছর ধরে এই বংশানুক্রমিক ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন মহম্মদ আবির- লোকসান সত্ত্বেও, শুধুই ভালোবাসার টানে।