ভারত কেশরী শ্যামাপ্রসাদের ১২৫: ইতিহাসের অজানা কথা, যা আপনার জানা জরুরি

ভারত কেশরী শ্যামাপ্রসাদ (AI নির্মাণ)

১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতায় জন্ম নিয়েছিলেন এক বাঙালি, যাঁর নাম আজও ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সোমবার সারা দেশ জুড়ে পালিত হচ্ছে নানা অনুষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে একটি প্রবন্ধ লিখে তাঁকে স্মরণ করেছেন, যেখানে শ্যামাপ্রসাদকে দেশের একতা ও অখণ্ডতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও এই দিনটি ঘিরে প্রস্তুতি তুঙ্গে, কারণ রাজ্যের বাজেটেই এবার ৬ জুলাইকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

মেধাবী ছাত্র থেকে সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য

শ্যামাপ্রসাদের পূর্বপুরুষের ভিটে ছিল হুগলি জেলার জিরাট-বলাগড় গ্রামে। বাবা স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বাংলার সুপরিচিত শিক্ষাবিদ ও আইনজ্ঞ, মা জোগমায়া দেবী। ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে প্রাথমিক পড়াশোনার পর প্রেসিডেন্সি কলেজে (Presidency College) ভর্তি হন শ্যামাপ্রসাদ। ১৯১৬ সালের ইন্টার আর্টস পরীক্ষায় তিনি সপ্তদশ স্থান অধিকার করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর ১৯২৩ সালে সেনেটের ফেলো নির্বাচিত হন। বাবার মৃত্যুর পর ১৯২৪ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে নাম লেখান, তারপর ইংল্যান্ডে গিয়ে লিংকনস ইন-এ (Lincoln’s Inn) পড়াশোনা করে ১৯২৭ সালে ব্যারিস্টার হন। মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে, ১৯৩৪ সালে, তিনি হয়ে ওঠেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য। এই সময়ই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে প্রথার বাইরে গিয়ে বাংলা ভাষায় ভাষণ দেওয়ান, যা তৎকালীন সময়ে বেশ বড় একটা সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।


বাংলাকে ভারতে রাখার লড়াই

দেশভাগের সময় শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসে দুটি বিপরীত পাঠ রয়েছে। একদিকে তাঁর সমর্থকদের দাবি, গোটা বাংলা যাতে পাকিস্তানে চলে না যায়, তার জন্য তিনি হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গকে ভারতে রাখার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ফলে আজকের পশ্চিমবঙ্গের অস্তিত্বই সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করিয়ে দেন, সেই সময় তিনি হিন্দু মহাসভার (Hindu Mahasabha) সভাপতি ছিলেন এবং ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের সময় তাঁর পরিচালিত ত্রাণ কমিটির কাজেও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ছাপ ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এই দ্বিমুখী ব্যাখ্যাই শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে আজও বিতর্কিত করে রেখেছে।

জনসঙ্ঘ গঠন ও কাশ্মীর সংগ্রাম

স্বাধীনতার পর জওহরলাল নেহেরুর অন্তর্বর্তী সরকারে শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হন শ্যামাপ্রসাদ। কিন্তু লিয়াকত-নেহরু চুক্তি (Liaquat-Nehru Pact) নিয়ে মতবিরোধের জেরে ১৯৫০ সালের ৬ এপ্রিল তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (Rashtriya Swayamsevak Sangh) এম এস গোলওয়ালকরের সঙ্গে পরামর্শ করে ১৯৫১ সালের ২১ অক্টোবর দিল্লিতে গঠন করেন ভারতীয় জনসঙ্ঘ (Bharatiya Jana Sangh), যে দলেরই পরবর্তী রূপ আজকের ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party)। ১৯৫২ সালের প্রথম লোকসভা নির্বাচনে জনসঙ্ঘ পায় মাত্র তিনটি আসন, যার একটিতে দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতা কেন্দ্র থেকে নিজেই জয়ী হন শ্যামাপ্রসাদ। জম্মু ও কাশ্মীরের (Jammu and Kashmir) জন্য পৃথক সংবিধান ও প্রবেশ পারমিট ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি, একে দেশভাগের নামান্তর বলে আখ্যা দিয়ে স্লোগান তোলেন, এক দেশে দুই বিধান, দুই প্রধান আর দুই নিশান চলবে না।

রহস্যময় মৃত্যু, আজও অমীমাংসিত প্রশ্ন

১৯৫৩ সালের ১১ মে পারমিট ব্যবস্থা লঙ্ঘন করে জম্মু ও কাশ্মীরে প্রবেশের সময় গ্রেপ্তার হন শ্যামাপ্রসাদ। পঁয়তাল্লিশ দিন বন্দি থাকার পর সেই বছরই ২৩ জুন রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় তাঁর। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে, একাংশের দাবি এতে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল, যদিও এই অভিযোগ কখনও প্রমাণিত হয়নি। মৃত্যুসংবাদ শুনে মা জোগমায়া দেবীর প্রতিক্রিয়া ইতিহাসে উদ্ধৃত হয়ে আছে, তিনি বলেছিলেন যে ছেলের এই আত্মত্যাগে তিনি গর্বিত। তাঁর মৃত্যুর পরেই কাশ্মীরে পারমিট ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত তুলে নেওয়া হয়েছিল।

রাজ্যের শ্রদ্ধার্ঘ্য, রাজনীতির অভিমুখ

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার এবার শ্যামাপ্রসাদকে ঘিরে বড় মাপের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রকল্প ঘোষণা করেছে। হুগলির জিরাটে তাঁর পৈতৃক ভিটে অধিগ্রহণ করে সেখানে গড়া হবে স্মৃতিসৌধ, গবেষণাকেন্দ্র ও আধুনিক গ্রন্থাগার, আর কলকাতায় বসবে তাঁর ১২৫ ফুট উঁচু একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি, অনেকটা গুজরাতের স্ট্যাচু অব ইউনিটি বা হায়দরাবাদের স্ট্যাচু অব ইকুয়ালিটির আদলে। এই পুরো পরিকল্পনায় রাজ্য অর্থদপ্তর প্রায় দুশো কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করাচ্ছেন, এই ধরনের স্মৃতি সংরক্ষণ উদ্যোগ যেমন একজন ঐতিহাসিক বাঙালি নেতার প্রাপ্য সম্মান, তেমনই এর মধ্যে দিয়ে বিজেপি নিজের আদর্শগত শিকড়কে বাংলার মাটিতে আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাও চালাচ্ছে, বিশেষত রাজ্যে দলের ক্ষমতায় আসার পর এই উদ্যোগের সময় বাছাই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

ইতিহাসের ভিন্ন পাঠ

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে আলোচনা তাই কখনওই একরৈখিক নয়। একদিকে শিক্ষাবিদ, সংগঠক ও কাশ্মীর ইস্যুতে আপসহীন নেতা হিসেবে তাঁর ভাবমূর্তি, অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও কার্যকলাপ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক, উভয়ই তাঁর উত্তরাধিকারের অংশ। সামগ্রিকতার নিরিখে ৬ জুলাই বাংলার এই কৃতী সন্তানকে স্মৃতির মণিকোঠায় সযত্নে লালন করা বাঙালি মাত্রেই অবশ্যকর্তব্য।