২৫ বৈশাখ, রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে সূচনা হল এক নতুন অধ্যায়ের। স্বাধীনতার পরে এই প্রথম বাংলায় সরকার গঠন করল ভারতীয় জনতা পার্টি। শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বিপুল জনসমাগমের মাঝে বাংলার নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। এভাবে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন মাইলফলক স্থাপন করল ভারত কেশরী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতাদর্শে গঠিত এই রাজনৈতিক দলটি। এদিনের এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের ঐতিহাসিক সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ-সহ বিজেপি শাসিত ২০টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, বিজেপির বহু কর্মী, সমর্থক, নেতা এবং অগণিত বাঙালি।
রাজ্যপাল রবীন্দ্র নারায়ণ রবির পৌরোহিত্যে প্রথমে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী। এরপর মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, নিশীথ প্রামাণিক, অশোক কীর্তনিয়া এবং ক্ষুদিরাম টুডু। সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিদের মন্ত্রিসভায় জায়গা দিয়ে রাজনৈতিক ভারসাম্যের বার্তাও দেয় বিজেপি। মতুয়া, আদিবাসী, মহিলা এবং উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নতুন মন্ত্রিসভায়।
ব্রিগেডে এদিনের অনুষ্ঠান শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বর্ণাঢ্য এই অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল বাঙালিয়ানার বিশেষ ছাপ। মঞ্চে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বিশাল প্রতিকৃতি দিয়ে সাজানো হয়েছিল অনুষ্ঠানস্থল। শুরুতেই মঞ্চে উঠে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এরপর দর্শকাসনে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে গড় হয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন তিনি। সেই বিরল দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
শপথের আগে সুসজ্জিত হুডখোলা গাড়িতে ব্রিগেডে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তাঁর পাশে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। গাড়িতে দাঁড়িয়ে তাঁরা উপস্থিত জনতার উদ্দেশে হাত নাড়েন। শপথের আগে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। তারপর শুরু হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান। শপথ অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক দিক থেকেও বিশেষ বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বিজেপি। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ তকমা দিয়ে এসেছে। তার পাল্টা জবাব হিসেবেই মঞ্চে ছৌ নৃত্য, লোকসঙ্গীত এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতের আয়োজন করা হয় বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
ব্রিগেডে খাবারের আয়োজনেও ছিল স্পষ্ট বাঙালিয়ানা। ঝালমুড়ি, রসগোল্লা, মিহিদানা, মিষ্টি দই, সন্দেশ, কমলাভোগ এবং লাড্ডুর স্টলে উপচে পড়ে ভিড়। বিশেষ করে ঝালমুড়ির স্টলগুলিতে মানুষের আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। আয়োজকদের দাবি, ২০টি ঝালমুড়ির স্টলে কয়েক হাজার প্যাকেট বিক্রি হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় ঝাড়গ্রামে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঝালমুড়ি খাওয়ার ছবি ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই এই খাবারটিকে বিজেপি বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা, স্মৃতি ইরানি, নীতীন গড়করি, শিবরাজ সিং চৌহান, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীস, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরি, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেল, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা-সহ একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত ছিল ৯৭ বছরের প্রবীণ বিজেপি কর্মী মাখনলাল সরকারের উপস্থিতি। তিনি ছিলেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সহযোগী। মঞ্চে উঠে তাঁকে প্রণাম করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপির আদর্শের শিকড় এবং ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে সামনে আনতেই এই বার্তা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
রাজকীয় শপথ অনুষ্ঠান শেষ করেই তিনি পৌঁছে যান জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিজেপির অন্যান্য নেতারা যেমন- তমোঘ্ন ঘোষ, বিঝড় ওঝা, সন্তোষ পাঠক, দলের নেত্রী মীনা দেবী পুরোহিত সহ প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথের মূর্তিতে মাল্যদান করে তার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন মুখ্যমন্ত্রী সহ বাকি নেতারাও।
জোড়াসাঁকোয় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতির বিকাশ কবিগুরুর ভাবনা ও আদর্শের পথ ধরেই হবে।’ রাজনীতির সংঘাত নয়, এখন বাংলার নবজাগরণ ও শুভবুদ্ধির সময় বলেও বার্তা দেন তিনি। কোনও প্রকার রাজনৈতিক তিক্ততা বা বিতর্কিত মন্তব্যে না গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সংযত কণ্ঠে শুভেন্দু বলেন, ‘আমি এখন মুখ্যমন্ত্রী। আমি এখন সকলের। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক।’
এদিন শুভেন্দু আরও বলেন, ‘বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনেক ক্ষতি হয়েছে। সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনাই এখন নতুন সরকারের লক্ষ্য।’ জোড়াসাঁকোয় দাঁড়িয়ে তিনি বাংলার পুনর্গঠনের ডাক দেন। তাঁর কথায়, ‘এখন অনেক দায়িত্ব রয়েছে। এখন একে অপরের সমালোচনার সময় নয়। যারা সমালোচনা করতে চাইছে করুক। তাঁদের চৈতন্য উদয় হোক।’ এরপর স্বামী বিবেকানন্দকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন শুধু এগিয়ে যাব। আমাদের একটাই মন্ত্র চরৈবতি চরৈবতি।’
শপথের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শুভেচ্ছা এবং যোগী আদিত্যনাথের সম্ভাষণ গ্রহণের পর তাঁর জোড়াসাঁকো সফর রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। বিজেপির বিপুল জয়ের পরও সংযত সুরে ঐক্যের বার্তা দিয়ে তিনি রাজ্যবাসীকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন বলে মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। তাঁদের মতে, প্রথম দিন থেকেই সাংস্কৃতিক আবেগ, ঐক্যের বার্তা এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চাইছে নতুন বিজেপি সরকার। রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিনে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন এবং তার পরেই জোড়াসাঁকো সফর সেই রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।