সংসার সামলানো মহিলাদের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের মতে, যাঁদের সাধারণত ‘হোমমেকার’ বলা হয়, তাঁরা কেবল ঘরের কাজই করেন না, বরং একটি পরিবারকে গড়ে তোলেন, পরবর্তী প্রজন্মকে লালন-পালন করেন এবং দেশের উন্নয়ন ও নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাই তাঁদের শুধু ‘হোমমেকার’ নয়, ‘দেশের নির্মাতা’ বলেই সম্মান জানানো উচিত।
পঞ্জাবের একটি মোটর দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এই মন্তব্য করে বিচারপতি সঞ্জয় করোলের বেঞ্চ। ২০০১ সালের নভেম্বরে পঞ্জাবে এক গৃহবধূর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে মোটর অ্যাকসিডেন্ট ক্লেম ট্রাইবুনালে ক্ষতিপূরণের আবেদন করা হয়। প্রথমে ট্রাইবুনাল পরিবারকে ২.৪২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট সেই অঙ্ক বাড়িয়ে ৮.৪ লক্ষ টাকা করে। কিন্তু নিহতার পরিবার আরও বেশি ক্ষতিপূরণের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলে শীর্ষ আদালত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৬২.৭৮ লক্ষ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেয় বিমা সংস্থাকে।
এই মামলার শুনানিতেই গৃহবধূদের অবদান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সামনে আসে। বিচারপতি করোলের বেঞ্চ জানায়, সংসার পরিচালনা, সন্তানদের লালন-পালন এবং পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়ার যে দায়িত্ব একজন মহিলা পালন করেন, তার অর্থনৈতিক মূল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শ্রমকে অবৈতনিক বলে উপেক্ষা করা যায় না।
আদালত আরও জানায়, বিবাহ কোনওভাবেই একজন মহিলাকে গৃহপরিচারিকার ভূমিকায় আবদ্ধ করার মাধ্যম হতে পারে না। সংসারের দায়িত্ব স্বামী ও স্ত্রীর যৌথ দায়িত্ব। কোনও মহিলা সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের পেশাগত জীবনেও সফল হতে চাইলে, তাকে পরিবারের প্রতি অবহেলা বা নির্মমতা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বিচারপতি করোলের পর্যবেক্ষণ, সমাজে অসংখ্য মহিলা প্রতিদিন এমন বহু আত্মত্যাগ করেন যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নজরে আসে না। তাঁরা নিজের সময়, শ্রম, দক্ষতা এবং শক্তি পরিবারের কল্যাণে ব্যয় করেন। এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে পরিবারের আর্থিক উন্নয়নেও অবদান রাখেন। ফলে তাঁদের কাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।
রায়ে সুপ্রিম কোর্ট উল্লেখ করেছে, একজন গৃহবধূ পরিবারের জন্য যে সেবা এবং শ্রম প্রদান করেন, তার ন্যূনতম অর্থনৈতিক মূল্য মাসে ৩০ হাজার টাকা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। দুর্ঘটনায় কোনও গৃহবধূর মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে বলেও নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
একই সঙ্গে দেশের সব হাই কোর্টকে মোটর দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের মতে, গৃহবধূদের অবদানকে যথাযথ মর্যাদা না দিলে সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তাঁদের শুধুমাত্র ‘হোমমেকার’ নয়, বরং ‘নেশন বিল্ডার’ বা দেশের নির্মাতা হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।