বিধানসভা নির্বাচনের আবহে বাংলার রাজনৈতিক মঞ্চে একাধিক বার্তা দিয়েছে বিজেপি। শুক্রবার রাজ্যে এসে পদ্ম শিবিরের সংকল্পপত্র প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর দাবি, প্রায় ১০ হাজার মানুষের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে তৈরি এই সংকল্পপত্র বাংলার ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা।
সংকল্পপত্র প্রকাশ করে অমিত শাহ বলেছেন, এটি শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং ‘বিকশিত ভারত’-এরই প্রতিফলন। তাঁর কথায়, ‘মহিলা, কৃষক, যুবক— সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের জন্য আশার আলো নিয়ে এসেছে এই সংকল্পপত্র।’ কৃষিক্ষেত্রে ধান, আলু ও আম চাষে সহায়তা এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার আশ্বাসের পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের জন্য কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে। শিল্পোন্নয়নের মাধ্যমে রাজ্যকে শীর্ষ শিল্পকেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যও তুলে ধরেছেন তিনি।
Advertisement
কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কিসান প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা বাড়িয়ে বছরে মোট ৯০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বিজেপি। সেই সঙ্গে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করে তিনি দাবি করেছেন, গত ১৫ বছরে সিন্ডিকেট রাজ, দুর্নীতি ও অনুপ্রবেশের কারণে বাংলার পরিস্থিতি অবনতির পথে।
Advertisement
‘সোনার বাংলা’ গড়ার ডাক দিয়ে শাহ ঘোষণা করেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু হবে। তিনি জানিয়েছেন, অনুপ্রবেশ রুখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হবে এবং বাংলাকে অনুপ্রবেশমুক্ত করা হবে। সংকল্প প্রকাশের মঞ্চ থেকে তিনি জানান, ‘অনুপ্রবেশকারীদের জন্য ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’।
পাশাপাশি সরকারি কর্মীদের জন্য সপ্তম পে কমিশন অনুযায়ী বেতন, ডিএ প্রদান এবং মহিলাদের জন্য মাসিক ৩০০০ টাকার আর্থিক সহায়তার মতো একাধিক জনমুখী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এই সংকল্পপত্রে যুবসমাজের জন্য বড়সড় ঘোষণা রয়েছে— বেকারদের মাসে ৩০০০ টাকা ভাতা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ১৫ হাজার টাকা সহায়তা এবং স্টার্ট-আপ ও ক্ষুদ্র শিল্পে উৎসাহ দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি। বিজেপির দাবি, আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি চাকরির ব্যবস্থা করা হবে।
কৃষকদের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বৃদ্ধি, সরাসরি ফসল কেনা এবং কোল্ড স্টোরেজ পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে নতুন এইমস, আইআইটি ও আইআইএম গড়ে তোলার পরিকল্পনা। পাশাপাশি কুড়মালি ও রাজবংশী ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার ইঙ্গিতও মিলেছে। পাশাপাশি একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে সংকল্পপত্র। উন্নয়নের রূপরেখায় দার্জিলিংকে হেরিটেজ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, কলকাতাকে ‘লিভিং সিটি’ হিসেবে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা এবং শহরের জন্য ১০ বছরের বিশেষ অ্যাকশন প্ল্যানের কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি। পাশাপাশি চারটি নতুন উপনগরী গড়ে তোলা, হলদিয়া বন্দরের উন্নয়ন।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রেও একাধিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে— ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পের বাস্তবায়ন, মহিলাদের নিরাপত্তার জন্য ‘দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড’, সরকারি চাকরিতে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ এবং সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াতের প্রতিশ্রুতি অনেকের নজর কেড়েছে। এছাড়া অন্তঃসত্ত্বাদের এককালীন আর্থিক সহায়তা, প্রবীণ ও বিধবাদের ভাতা বৃদ্ধির আশ্বাসও দিয়েছে বিজেপি।
পরিকাঠামো উন্নয়নে কলকাতা মেট্রো সম্প্রসারণ, নতুন বন্দর নির্মাণ, রেলপথ সম্প্রসারণ এবং বন্ধ জুটমিল চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বিশেষ উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, আধুনিক থিয়েটার কেন্দ্র গঠন ইত্যাদি। ‘বন্দে মাতরম’ মিউজিয়াম তৈরি কথা রয়েছে শাহ প্রকাশিত সংকল্পপত্রে। বাঙালির আমিষ খাদ্যাভ্যাস নিয়েও আশঙ্কা খারিজ করে তিনি বলেছেন, ‘মাছ-ডিমও বন্ধ হবে না।’
Advertisement



