বদলের রাজ্যে মাসে হাজার কোটির রাজস্ব বৃদ্ধি, তৃণমূলের দুর্নীতি আটকে বাড়ল রাজস্ব

Image: ANI

রাজ্যে বিজেপি সরকার এসেই তাদের প্রথম জনমুখী বাজেট পেশ করে। আর সেই সময় থেকেই ওয়াকিবহাল মহলে প্রশ্ন উঠতে থাকে, বিপুল ঋণের বোঝা সামলে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং পরিকাঠামো খাতে এত বড় ব্যয়ের পরিকল্পনা কী করে করা সম্ভব! বাজেটের জবাবি ভাষণে সেই প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, বীরভূমের পাথর খাদান থেকে আগে রাজ্য সরকারের বছরে মাত্র ৮ কোটি টাকা রাজস্ব মিলত। বাকি অর্থ ক্যামাক স্ট্রিট হয়ে দুবাইয়ে চলে যেত। তাঁর দাবি, সরকার গঠনের পর মাত্র এক মাসেই ওই খাতে ৮৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। সেই প্রসঙ্গেই তিনি অভিযোগ করেন, ‘তার মানে ভাইপো বছরে ১১০০ কোটি টাকা চুরি করত’।

সরকারি সূত্রে এবার যে তথ্য সামনে এসেছে, তা মুখ্যমন্ত্রীর সেই দাবিকেই আরও জোরালো করছে। নবান্নের হিসেব অনুযায়ী, ৯ মে নতুন সরকার গঠনের পর থেকে ৯ জুন পর্যন্ত এক মাসে রাজস্ব আদায় গত আর্থিক বছরের তুলনায় একই সময়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বেশি হয়েছে। সরকারের দাবি, এই প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে বার্ষিক আদায়ে বিজেপি সরকার তৃণমূল আমলের তুলনায় বহু গুণ এগিয়ে থাকবে।

তৃণমূল সরকারের সময়ে জমি কেনাবেচার রেজিস্ট্রি এবং আবগারি দপ্তরের রাজস্বই ছিল সরকারের আয়ের প্রধান ভরসা। বর্তমান সরকারের দাবি, এখন আয়ের আরও একাধিক উৎস কার্যকর হয়েছে, এগুলি থেকেই অতীতে সবচেয়ে বেশি কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল। আর তার মধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত চালাচ্ছে।  অর্থদপ্তরের মতে, এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির পথ বন্ধ হওয়াতেই সরকারি কোষাগারে রাজস্বের পরিমাণ উল্লেখ্যযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীও বিধানসভায় একাধিকবার দাবি করেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েই তিনি আগের সরকার ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন।


মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, রাজস্ব লুঠের সঙ্গে রাজনীতি ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের যোগসাজশ ছিল। সরকারি অর্থ কোন কোন খাত থেকে কীভাবে বেরিয়ে গিয়েছে এবং তার পরিমাণ কত, সেই তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরতে তিনি শ্বেতপত্র প্রকাশের ঘোষণা করেছিলেন। সেই কাজও শুরু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বৃহস্পতিবার নবান্নে বৈঠক করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

তৃণমূল সরকার দাবি করত, অনলাই টেন্ডার এবং সম্পত্তি রেজিস্ট্রি ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে সরকারি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাম আমলের দুর্নীতির পথ বন্ধ করা গিয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকারের অভিযোগ, আধুনিক প্রযুক্তি চালু হলেও তার মধ্যেই ফাঁকফোকর রেখে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছিল। সরকারের দাবি, সেই ব্যবস্থাগত দুর্বলতাগুলিই এখন চিহ্নিত করে বন্ধ করা হচ্ছে।

সরকারি কোষাগারের অন্যতম প্রধান রাজস্ব উৎস হওয়া সত্ত্বেও বালি, কয়লা এবং পাথর খাদান থেকে অতীতে খুবই কম রাজস্ব আদায় হতো বলে অভিযোগ। বিধানসভায় এক মাসের হিসাব তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রীও সেই দাবি করেছিলেন। নবান্ন সূত্রে খবর, বীরভূমের একটি নির্দিষ্ট পাথর খাদান থেকে আগে বছরে প্রায় ৬০ কোটি টাকা রাজস্ব আসত। বর্তমানে সেই একই খাদান থেকে প্রতি মাসেই প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়ছে। অর্থাৎ আগে যেখানে এক বছরে যে পরিমাণ রাজস্ব মিলত, এখন প্রশাসনিক নজরদারির ফলে তার থেকেও বেশি অর্থ এক মাসেই আদায় হয়েছে বলে সরকারের দাবি।

এদিকে, তৃণমূলের ইলেক্টোরাল বন্ড নিয়েও ইডির তদন্তে নতুন তথ্য উঠে এসেছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি। রাজস্ব ফাঁকির একটি বড় অংশ ইলেক্টোরালল বন্ডের মাধ্যমে তৃমমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ফ্রজি করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অর্থদপ্তরের এক শীর্ষ কর্তার বক্তব্য, বাজেটে যে ব্যয়ের হিসাব ধরা হয়, তার সবটাই রাজ্যের নিজস্ব আয়ে মেটাতে হয় না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব চুরি বন্ধ করা গেল উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অর্থের জোগান কোনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।