পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির পারদ কিছুতেই নামছে না। এবার আলোচনার কেন্দ্রে রাজ্যসভার (Rajya Sabha) তিনটি শূন্য আসনের নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২৪ জুলাই হতে চলেছে এই ভোট, আর তার আগেই রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন তুঙ্গে, শেষ পর্যন্ত কারা পাচ্ছেন বিজেপির (BJP) টিকিট।
কবে ভোট, কেন এই নির্বাচন
গত ৬ জুলাই নির্বাচন কমিশন জানিয়ে দিয়েছে সূচি। মনোনয়ন জমার শেষ দিন ১৪ জুলাই, স্ক্রুটিনি ১৫ জুলাই, মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৭ জুলাই। ভোট হবে ২৪ জুলাই সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত, গণনা সেদিনই সন্ধ্যায়। গোটা প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে।
এই তিনটি আসন খালি হয়েছে জুন মাসে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) তিন রাজ্যসভা সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইকের ইস্তফার পর। বিধানসভা ভোটে দলের ভরাডুবির পর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁরা একে একে রাজ্যসভার সদস্যপদ এবং দলের প্রাথমিক সদস্যপদ, দুটোই ছেড়ে দেন। উল্লেখ্য, সুখেন্দুশেখর রায় ও প্রকাশ চিক বরাইকের রাদ্যসভার সদস্যপদের মেয়াদ ছিল ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, আর সুস্মিতা দেবের মেয়াদ ছিল ২০৩০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। অর্থাৎ পূর্ণ মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান তাঁরা।
বিজেপির টিকিটে কি ফিরছেন তাঁরাই
রাজনৈতিক মহলে জোরালো চর্চা চলছে, এই তিনজনকেই ফের বিজেপির প্রতীকে রাজ্যসভায় পাঠানো হতে পারে। বিশেষ করে সুখেন্দুশেখর রায়ের নাম নিয়ে আভ্যন্তরীণ আলোচনা প্রায় পাকা বলেই খবর রাজনৈতিক মহলে। তবে এখনও পর্যন্ত দিল্লির তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি, আর সুস্মিতা দেব বা প্রকাশ চিক বরাইকের নাম নিয়ে কোনও নিশ্চিত সূত্র মেলেনি। ফলে গোটা বিষয়টাই আপাতত সম্ভাবনার স্তরে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত, এই তিন জনকে নির্বাচনের পিছনে একটা স্পষ্ট বার্তা লুকিয়ে থাকতে পারে। সুখেন্দুশেখর রায়ের সংসদীয় অভিজ্ঞতা এবং সাংবিধানিক বিষয়ে দখল সুবিদিত। সুস্মিতা দেব জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ, মহিলা নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বের প্রতীক হিসেবেও গণ্য করা হয় তাঁকে। আর প্রকাশ চিক বরাইকের দীর্ঘদিনের আদিবাসী প্রতিনিধিত্ব উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে দলের সামাজিক ভিত মজবুত করার কৌশলের অংশ হতে পারে বলে মত রাজনৈতিক মহলের।
সংখ্যার অঙ্কে বিজেপি কতটা এগিয়ে
২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপির বর্তমান শক্তি ২০৮। রাজ্যসভার এই তিন আসনের ভোটে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোট পদ্ধতিতে (Single Transferable Vote) জিততে হলে প্রতিটি প্রার্থীর প্রয়োজন মোটামুটি ৭০টি প্রথম পছন্দের ভোট। বিজেপির হাতে থাকা বিধায়ক সংখ্যা বিচারে তিনটি আসনেই জয় কার্যত সময়ের অপেক্ষা।
তৃণমূলের ভাঙন, কার দখলে কত বিধায়ক
এই প্রেক্ষাপটে জড়িয়ে রয়েছে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ভাঙনও। বিধানসভা ভোটে তৃণমূল জিতেছিল ৮০টি আসন। ভোটের ফলাফলের পর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দলের ৫৮ জন বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মেনে নিয়ে বিধানসভার স্পিকারের কাছে দাবি জানান, পরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪-তে। বাকি ১৬ জন বিধায়ক রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে। দলের নাম, প্রতীক এবং তহবিলের অধিকার নিয়েও দুই শিবিরের মধ্যে টানাপোড়েন এখনও অব্যাহত, সম্প্রতি দুই পক্ষই আলাদা আলাদা করে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে।
আদালতের প্রশ্নচিহ্নও ঝুলে
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে ইতিমধ্যেই মামলা দায়ের হয়েছে। আদালত সেই স্বীকৃতিতে স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করলেও গোটা বিষয়টি এখনও বিচারাধীন। ফলে তৃণমূলের প্রকৃত পরিচয় ও নেতৃত্ব নিয়ে আইনি অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি।
রাজ্যসভায় কী প্রভাব পড়বে জাতীয় রাজনীতিতে
এই তিন আসনে জয় শুধু রাজ্য রাজনীতির লড়াই নয়, এর জাতীয় গুরুত্বও রয়েছে। বর্তমানে এনডিএ-র (NDA) রাজ্যসভায় শক্তি ১৫২, তিনটি আসনে জয় এলে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৫৬-তে। অন্যদিকে তৃণমূলের বর্তমান রাজ্যসভা শক্তি ৯, এই তিন আসন হাতছাড়া হলে সেই সংখ্যা আরও কমবে।
এখনও যা অনিশ্চিত
সব মিলিয়ে সংখ্যার অঙ্কে বিজেপির জয় প্রায় নিশ্চিত বলা গেলেও, ঠিক কাদের প্রার্থী করা হবে, তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কিছু জানা যায়নি। দিল্লি থেকে সবুজ সংকেত এলেই স্পষ্ট হবে ছবিটা। তবে তৃণমূলের পদত্যাগীদের নিয়ে যে বড় সিদ্ধান্তই নিতে চলেছে বিজেপি, সে ব্যাপারে মোটের উপর নিশ্চিত তথ্যাভিজ্ঞ মহল।