এই চলে যাওয়াকে ‘অকালে চলে যাওয়া’ বলে অভিহিত করা যায় না। তবু শতবর্ষ পেরিয়ে আচার্য সুনীতিকুমার পাঠকের এই চলে যাওয়াটা মেনে নিতেও কষ্ট হয়। বুধবার ৪ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১৫ মিনিটে আচার্ষ সুনীতিকুমার পাঠক ১০১ বছর বয়সে তাঁর শান্তিনিকেতনের অবনপল্লির ‘আকাশদীপ’ বাড়িতে সজ্ঞানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বছর দুয়েক আগেই প্রয়াত হয়েছেন সুনীতিবাবুর স্ত্রী। রাত ১০টা নাগাদ তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থতাবোধ করলে, বিছানায় উঠে বসেন এবং মিনিট পনেরোর মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে আধিকারিক এবং অন্যান্যরা তাঁর বাড়িতে চলে আসেন।
বৃহস্পতিবার ৫ ডিসেম্বর তাঁর বাড়ির সামনে মানুষের ঢল নেমে যায় আচার্য সুনীতিকুমার পাঠককে শেষ শ্রদ্ধা জানতে। এদিন তাঁর ছেলে ড. আশিসকুমার পাঠক তাঁর কর্মস্থল চণ্ডীগড় থেকে শান্তিনিকেতনের আকাশদীপ বাড়িতে এসে পৌঁছনোর পরে, আকাশদীপ বাড়িকে অন্ধকার করে আচার্যের মৃতদেহ শান্তিনিকেতন আশ্রম প্রাঙ্গণে এনে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরেই মৃতদেহ অন্তিম সৎকারের জন্য কঙ্কালীতলার বৈদ্যুতিক চুল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়।
আচার্য সুনীতিকুমার পাঠক ১৯২৪ সালের ১ মে জন্ম গ্রহণ করেন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার মালিহাটি গ্রামে মামার বাড়িতে। মাতৃহীন হয়ে সুনীতিকুমার পাঠক মামার বাড়িতে থেকেই বড় হন এবং পড়াশোনা করেন। শৈশবেই তিনি চাক্ষুষ করেছিলেন পরিণত বয়সের গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। সেই সময় থেকেই তিনি শান্তিনিকেতনে এসে বিশ্বভারতীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পড়াশোনা করেন কলকাতার তীর্থপতি ইনস্টিটিউশন, সংস্কৃত কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রবৃত্তি নিয়ে তিব্বতী ভাষাশিক্ষা শুরু করেন। প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সুনীতিকুমার পাঠককে কালিম্পিংয়ে তিব্বতী ভাষাচর্চার সুযোগ করে দেন।
এরপরই সুনীতিকুমার পাঠক পৌঁছে যান তাঁর জীবনের স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রভূমি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে।
এখানে ২০৫ টাকা মাসিক বেতনে যোগ দেন বিশ্বভারতীর পুঁথি বিভাগে। সেখানে তাঁর জ্ঞানচর্চ্চার এক একটি দিক উন্মোচিত হতে থাকে। তিনি দক্ষ হয়ে ওঠেন বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, তিব্বতী, মাঙ্গলিক, চিনা, পালি, প্রাকৃতিক সংস্কৃতের মতো নয়টি ভাষায়। বিশ্বভারতীতে যোগ দিয়েই তিনি অধ্যাপক সি আর লামাকে নিয়ে বিশ্বভারতীতে ভারত-তিব্বতী ভাষাচর্চা শুরু করেন। বিশ্বভারতীতে চালু হয় ভারত-তিব্বতী ভাষাচর্চা বিভাগ। তাঁরই প্রচেষ্টায় বিশ্বভারতীতে সংগৃহীত হয় তালপাতার পুঁথির সম্ভার। ভারত সরকার ১৯৬১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সীমান্তে কর্মরত সেনাদের তিব্বতী ভাষাতে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সুনীতিকুমার পাঠককে নিয়ে যায় ভারত-তীব্বত সীমান্তে। লাদাখ সীমান্তে তিনি ভারতীয় সেনাদের তিব্বতী ভাষার ইংরেজি অনুবাদ করে দিতেন।
তিনি পরিভ্রমণ করেন এবং বক্তৃতা দেন ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলিতে। ভারত-তিব্বত সীমান্তে তাঁর পরিভ্রমণের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী তাঁকে গাড়ি দিলেও তিনি তা ব্যবহার না করে পায়ে হেঁটে বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘুরতেন এবং ছোট ছোট জনবসতি এলাকায় থেকে, সেখানকার জনজীবনকে প্রত্যক্ষ করতেন। তিনি বলতেন, গাড়িতে ঘুরে জনজীবনকে প্রত্যক্ষ করা যায় না। এভাবে দীর্ঘ কয়েক বছর কাটানোর পরে তিনি পুনরায় ১৯৬৯ সালে বিশ্বভারতীতে ফিরে আসেন। বৌদ্ধ ভাষার পণ্ডিত এবং বৌদ্ধতন্ত্র ও বৌদ্ধশাস্ত্র নিয়ে গবেষণার জন্য তাঁকে ২০০৭ সালে দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতি পুরস্কার। ভাষাচর্চা ও গবেষণা নিয়ে তাঁর রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ এবং প্রবন্ধ সংকলন রয়েছে। ১৯৮৪ সালে তিনি বিশ্বভারতী থেকে অবসর নেওয়ার পরেও আমৃত্যু একজন শ্রুতি লেখককে দিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন। এবার যবনিকা পড়লো সেই কর্মময় জীবনে।