আদিবাসীদের প্রতি ঐক্যের বার্তা, উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন রাষ্ট্রপতির

আদিবাসী সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানালেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল ও অন্যান্য জনজাতির মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন তিনি। শনিবার শিলিগুড়ির কাছে বাগডোগরায় আয়োজিত আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিলের নবম সম্মেলনে যোগ দিয়ে এই মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি।

শনিবার সকালে ভারতীয় বায়ুসেনার বিশেষ বিমানে বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছন রাষ্ট্রপতি। সেখান থেকে সড়কপথে তিনি সম্মেলনস্থলে যান। অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় তফসিলি ও অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী দুর্গা দাস উইকে এবং দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা। সম্মেলনের সূচনায় প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতীক হিসেবে মঞ্চের পাশে একটি শালগাছের চারা রোপণ করেন রাষ্ট্রপতি।

বক্তৃতায় আদিবাসী ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রায় আড়াই শতাব্দী আগে কিলকা মাঝি শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। পরে সিধু-কানহু সহ বহু নেতা সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। রাষ্ট্রপতির কথায়, সাঁওতাল সমাজ কখনও অন্যকে শোষণ করেনি, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। তাই তাঁদের ইতিহাস বীরত্বের ইতিহাস।

তবে সম্মেলনের আয়োজন নিয়েও কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, অনেক সাঁওতাল মানুষকে সম্মেলনস্থলের বাইরে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গিয়েছে। কেউ যেন তাঁদের ভিতরে আসতে দিচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিলের এই সম্মেলনে সবার জন্য দরজা খোলা থাকা উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘অনেকেই চান না সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধ হোক বা শক্তিশালী হয়ে উঠুক। অথচ দেশের ইতিহাসে কিলকা মাঝি, সিধু-কানহুর মতো বহু আদিবাসী নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।’ ইতিহাসে অনেকের নাম না থাকলেও তাঁদের অবদান অস্বীকার করা যায় না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

উত্তরবঙ্গের আদিবাসী সমাজের উন্নয়ন প্রসঙ্গেও প্রশ্ন তোলেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর মতে, এই অঞ্চলের সাঁওতাল ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনজাতির মানুষের উন্নয়ন কতটা হয়েছে তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সরকারি সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা তাঁরা বাস্তবে পাচ্ছেন কি না, সেই বিষয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

শিক্ষার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের জন্য একলব্য মডেল আবাসিক বিদ্যালয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সব জায়গায় সেই সুযোগ পৌঁছয়নি। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে নিজেদের সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও স্বাধীনতার চেতনা গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন তিনি।

ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়েও বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রপতি। তিনি জানান, সম্প্রতি সাঁওতালি ভাষার অলচিকি লিপির ১৫০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন হয়েছে। বহু সাঁওতালি লেখক জাতীয় স্তরে সম্মান পেয়েছেন। তাঁদেরও সমাজের উন্নয়নে দায়িত্ব নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যে সম্মেলনে উপস্থিত আদিবাসী প্রতিনিধিদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে। তাঁর বক্তৃতায় যেমন ঐক্যের আহ্বান ছিল, তেমনই ছিল আত্মসমালোচনার সুর, যা আদিবাসী সমাজের ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়ে নতুন করে ভাবার বার্তা দেয়।