নিয়োগ কাণ্ডে সিবিআই-এর পর ইডি-র হাতে গ্রেপ্তার প্রসন্ন রায়

কলকাতা, ২০ ফেব্রুয়ারি: প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ইডির হাতে গ্রেপ্তার হলেন প্রসন্ন রায়। এর আগেও শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার করে সিবিআই। গতকাল সোমবার তাঁকে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে ইডি। এরপর রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি করেছে, প্রসন্নর অধীনে বহু এজেন্ট নিয়োগ কাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। প্রসন্ন রায় এইসব এজেন্ট এবং শিক্ষা দপ্তরের অভিযুক্ত কর্তাদের মাঝে মিডলম্যান হিসেবে কাজ করতেন। কে কে চাকরি পাবেন, তার তালিকা তৈরি করে এজেন্টরা প্রসন্নকে দিতেন। সম্প্রতি সেই মামলায় কোর্টের দ্বারস্থ হন প্রসন্ন রায়। আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করে। গতকাল সকালে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে টানা জিজ্ঞাসাবাদ চলে। এরপর রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।

প্রসঙ্গত শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতি কাণ্ডে ২০২২ সালের ২৩ জুলাই প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই দুর্নীতিতে জড়িত একের পর এক ব্যক্তির নাম সামনে আসতে থাকে। সেভাবেই প্রসন্ন রায়ের নাম সামনে চলে আসে সেবছর আগস্ট মাসেই। তদন্তে উঠে আসে একসময়ের রং মিস্ত্রি প্রসন্নের বিশাল সম্পত্তির বহর। কী নেই সেখানে? ২০২২এর ২৬ অগস্ট নিউটাউন থেকে সিবিআই-এর হাতে গ্রেপ্তার হন প্রসন্ন কুমার রায়। সেসময় তদন্তে জানা যায়, প্রসংণের ভূরিভূরি টাকা, জমি, ফ্ল্যাট থেকে শুরু করে বিলাসবহুল রিসর্ট, মাছের ভেড়ি। কী নেই প্রসন্নর সম্পত্তির তালিকায়! নারকেলডাঙায় টালির চালের বাড়ি। নিম্নবিত্ত পরিবার। প্রথম জীবনে রং মিস্ত্রির কাজ করতেন প্রসন্ন। পরে পার্থ-যোগে ভাগ্য খোলে তাঁর। ৭-৮ বছরে কার্যত কুবের হয়ে ওঠেন প্রসন্ন রায়। দেশে-বিদেশে ছড়ানো কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি।

রাজারহাটের ধারসায় অন্তত ১০ কাঠা জমির ওপর পেল্লায় বাগানবাড়ি। সূত্রের খবর, প্রসন্নর স্ত্রী সোনি রায়ের নামে এই বাড়ির মালিকানা রয়েছে। চকপাঁচুরিয়ায় আড়াই একর জমির মালিকানাও প্রসন্নর। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মোট ১৩৮টি জমি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করেন। পাঁচ বছরে ১ হাজার ৩৪ কাঠা জমিতে ২০০ কোটির বিনিয়োগ। ২০১৭ সালে জমি কেনায় সেঞ্চুরিই করে ফেলেন প্রসন্ন! রাজস্ব বিভাগে প্রসন্নর নামে নথিভুক্ত হওয়া ১০৯টি ডিডের মধ্যে ১০৩টি শুধু জমিরই ডিড!


সাপুরজিতে পার্থ-ঘনিষ্ঠ প্রসন্নর নামে আড়াই বিঘা জমিরও সন্ধান মিলেছে। প্রথমে জলা জমি কেনা হলেও পরে মাটি ফেলে তা বুজিয়ে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা হয়। এই আড়াই বিঘা জমির দাম কোটি টাকার কম তো নয়ই। এছাড়া নিউটাউনের রবিরশ্মিতে প্রসন্ন রায়ের দুটি ভিলার হদিশ। সূত্রের খবর, প্রতি ভিলার মূল্য কোটি টাকা। এখানে নাকি দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন প্রসন্ন। নিউটাউনের এই হোটেলের ৫ তলায় খোঁজ প্রসন্ন রায়ের আরও একটি সংস্থার। পন্টিয়াক মার্চেন্ট’স প্রাইভেট লিমিটেড নামে সেই সংস্থার নামেই চলত একাধিক ব্যবসা। হাওড়ার শ্যামপুরের গাদিয়াড়ায় শালি জমিতে ১০ বিঘার ওপর তৈরি রিসর্টও নাকি প্রসন্ন রায়ের। বিরোধীদের অভিযোগ, চাকরি বিক্রির টাকা থেকেই গড়ে উঠেছে কয়েক কোটি টাকার এই রিসর্ট।

শুধু তাই নয়, ৩০ বিঘে জমির ওপর তৈরি বাগনানের টাইলস কোম্পানি। ২০১৫ সালে ১২ কোটি টাকা দিয়ে কারখানাটি কেনেন প্রসন্ন। উত্তরবঙ্গেও ২টি চা বাগান ও একটি রিসর্টের মালিকানা এসএসসি দুর্নীতির এই মিডলম্যানের নামে। স্থানীয়দের দাবি, আলিপুরদুয়ারের চিলাপাতার এই বিলাসবহুল রিসর্টে কোনদিনই যেতেন না প্রসন্ন। সিবিআই স্ক্যানারে আলিপুরদুয়ারের এই রিসর্টও। দিঘা, পুরি, সুন্দরবনেও হোটেল প্রসন্নর। স্পষ্ট প্রসন্নর ফেসবুক পোস্ট থেকেই। হোটেল মিলি নামে নিউ দিঘার হোটেলটি তদন্তকারীদের রেডারে। সূত্রের খবর, দুবাইতেও বিপুল প্রতিপত্তি প্রসন্নর। হোটেল সহ একাধিক ব্যবসার খোঁজ মিলেছে পার্থ ঘনিষ্ঠের। দুবাই, ইজরায়েল সহ একাধিক দেশ কার্যত ঘরবাড়ি ছিল প্রসন্নর।