‘আন ম্যাপড’ ও ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ ভোটার কত, জানে না কমিশন

প্রতীকী চিত্র

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে প্রশ্নের পাহাড় ক্রমশই বড় হচ্ছে। অথচ সেই প্রশ্নের স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য উত্তর এখনও অধরাই নির্বাচন কমিশনের কাছে। বিস্ময়করভাবে কমিশন নিজেই স্বীকার করেছে, কতজন ভোটারকে শুনানিতে ডাকা হয়েছে, কতজন হাজির হয়েছেন কিংবা কতজন নথি জমা দিয়েছেন, তার কোনও পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও তাদের হাতে নেই।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, ‘মানচিত্রবিহীন’ ও ‘যুক্তিগত অসঙ্গতি’ হিসেবে চিহ্নিত ভোটারদের সংখ্যা। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যাচ্ছে, রাজ্যে প্রায় এক কোটিরও বেশি ভোটারের নাম এই দুই শ্রেণিতে পড়েছে। কিন্তু তাঁদের চূড়ান্ত তালিকা, কতগুলি নোটিস জারি হয়েছে, কতজন শুনানিতে উপস্থিত হয়েছেন, কতজন নথি জমা দিয়েছেন— এই সংক্রান্ত কোনও স্পষ্ট ও নির্ভুল তথ্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যাচ্ছে, গোটা প্রক্রিয়া প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় একাধিক ক্ষেত্রে তথ্য সংরক্ষণ ও আদানপ্রদানের ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিয়েছে। তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার গোলযোগের কারণে বহু ক্ষেত্রে শুনানিতে উপস্থিত থেকেও ভোটারদের নাম ‘অনুপস্থিত’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। কোথাও আবার নথি জমা পড়লেও তার অবস্থান বদলাচ্ছে না। এই প্রযুক্তিগত বিভ্রাটই প্রশাসনিক বিভ্রান্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।


এই পরিস্থিতিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে, ‘মানচিত্রবিহীন’ ও ‘যুক্তিগত অসঙ্গতি’র ভোটারদের পৃথক তালিকা প্রকাশ করতে। কিন্তু তথ্য যাচাইয়ের অজুহাতে কমিশন এখনও সময় চাইছে। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তথ্য প্রকাশে এই বিলম্ব গোটা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই ত্রুটিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার ফলে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। নাম বাদ পড়ার আতঙ্ক, নোটিস সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, শুনানির তথ্যের গরমিল— সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় ও বিভ্রান্তি বাড়ছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের দাবি, ‘কাউকে বাদ দেওয়ার কোনও উদ্দেশ্য নেই’। কিন্তু তথ্যের স্বচ্ছতা, নির্ভুল পরিসংখ্যান ও স্পষ্ট ব্যাখ্যার অভাবেই এখন বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া গভীর প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের বড় অংশের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়, বরং একটি গুরুতর গণতান্ত্রিক সঙ্কটের ইঙ্গিত। কারণ ভোটাধিকার যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে তার প্রভাব পড়বে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তির উপরেই। নির্বাচন কমিশনের তথ্যহীনতা ও ব্যবস্থাগত দুর্বলতা মিলিয়ে এই মুহূর্তে এই প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের আস্থা ক্রমশ ভেঙে পড়ছে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।