একদিকে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে রাজ্যে ১০ লক্ষ ৪৬ হাজার ২২৪টি রেশন কার্ডের ওপর কোপ, অন্যদিকে ঠিক একই সময়ে ১০ লক্ষ ৭২ হাজার ৭২৮টি নতুন কার্ড বণ্টন। কেন্দ্রীয় খাদ্য মন্ত্রকের কাছে রাজ্য খাদ্য দপ্তরের পাঠানো সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে রেশন ব্যবস্থার এই বিপুল রদবদলের ছবি সামনে এসেছে। বাতিল হওয়া কার্ডগুলির মধ্যে শুধু ‘অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা’র (Antyodaya Anna Yojana-AAY) মতো অতিদরিদ্র শ্রেণির কার্ডই রয়েছে ১ লক্ষ ৪২ হাজার। মূলত মৃত ব্যক্তি ও ভুয়ো বা সচ্ছল গ্রাহকদের নাম ছেঁটে ফেলে ‘প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা’র (PMGKAY) তালিকা ঝাড়াইবাছাই করতেই এই পদক্ষেপ বলে নবান্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। তবে এই সাফাই অভিযানের আড়ালে এক কৌশলী চালে নিজেদের কোষাগারের ভর্তুকির বোঝাও অনেকটা হালকা করে নিয়েছে রাজ্য সরকার।
ভর্তুকির অঙ্ক
কেন্দ্রীয় খাদ্য প্রকল্পের আওতায় কোন রাজ্যে কত জন মানুষ নিখরচায় বা ভর্তুকিতে রেশন পাবেন, তার ঊর্ধ্বসীমা ২০১৩ সালেই বেঁধে দিয়েছিল নয়াদিল্লি। এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই কোটা অপরিবর্তিত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই বরাদ্দ কোটার সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ২ লক্ষ। রাজ্যের পাঠানো সর্বশেষ হিসেব বলছে, বর্তমানে রাজ্যে এই কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধাভোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৪১ হাজার ৫৩৩ জনে।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, ১০ লক্ষের বেশি কার্ড বাতিল হওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় কোটায় যে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল, তা ফেলে না রেখে দ্রুত পূরণ করে ফেলা হয়েছে। এত দিন যাঁরা রাজ্য সরকারের নিজস্ব অর্থে চলা রেশন প্রকল্পের অধীনে খাদ্যশস্য পাচ্ছিলেন, তাঁদের একটা বড় অংশকে সরিয়ে এনে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের ওই ফাঁকা জায়গায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক রদবদলের ফলে কেন্দ্রের কোটাও পূর্ণ থাকল, আবার রাজ্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে খাদ্য ভর্তুকি বাবদ যে বিপুল খরচ হত, তা-ও এক ধাক্কায় অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হল।
স্ক্যানারে ২৪ লক্ষ কার্ড
রেশন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ফেরাতে সম্প্রতি দেশজুড়ে প্রায় ৬ কোটি সন্দেহজনক রেশন কার্ড চিহ্নিত করেছে কেন্দ্র। সেই সূত্রেই দুটি পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৪ লক্ষ সন্দেহজনক কার্ডধারীর নামের তালিকা রাজ্যে পাঠিয়ে সরেজমিনে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। খাদ্য দপ্তরের যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় দেখা গিয়েছে, তালিকায় এমন বহু নাম রয়েছে যাঁরা নিয়মিত আয়কর দেন, আর্থিকভাবে যথেষ্ট সচ্ছল কিংবা চারচাকা গাড়ির মালিক।
এছাড়া মৃত ব্যক্তির নামে বছরের পর বছর রেশন তোলা এবং একই ব্যক্তির নামে একাধিক কার্ড থাকার মতো বিস্তর অনিয়মও ধরা পড়েছে। এই অযোগ্য ও ভুয়ো গ্রাহকদের ছেঁটে ফেলতেই গত তিন মাসে ধাপে ধাপে সাড়ে দশ লক্ষের বেশি কার্ড নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। খাদ্য দপ্তর সূত্রের ইঙ্গিত, যাচাইকরণের কাজ এখনও পুরোদমে চলছে এবং অদূর ভবিষ্যতে আরও বহু কার্ড বাতিলের তালিকায় ঢুকতে চলেছে।
রেশন ডিলারদের প্রশ্ন
কেন্দ্রের পাঠানো ২৪ লক্ষের তালিকার মধ্যে ১০ লক্ষ কার্ড বাতিল হলেও বাকি অর্ধেক কার্ডে এখনও কেন হাত দেওয়া গেল না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এর নেপথ্যে পুরোনো তিক্ত অভিজ্ঞতার ছায়া দেখছেন অনেকেই। অতীতে এক ধাক্কায় প্রচুর রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় করতে গিয়ে রাজ্যজুড়ে তীব্র জনরোষের মুখে পড়েছিল প্রশাসন। সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আঁচ পেয়ে শেষ পর্যন্ত বাতিল হওয়া বহু কার্ড ফের চালু করতে বাধ্য হয়েছিল রাজ্য সরকার। সেই কারণেই এবার পা মেপে এগোচ্ছে খাদ্য দপ্তর।
যদিও কার্ড বাতিলের এই প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছেন রেশন ডিলাররা। ‘অল-ইন্ডিয়া রেশন ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সাধারণ সম্পাদক বিশ্বম্ভর বসুর অভিযোগ, বহু গ্রাহক রেশন দোকানে এসে জানতে পারছেন যে তাঁদের কার্ড আচমকা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে, অথচ আগে থেকে তাঁদের কিছুই জানানো হয়নি। সংগঠনের দাবি, কোন কার্ড ঠিক কী কারণে বাতিল করা হচ্ছে, তা সরকারকে প্রকাশ্যে জানাতে হবে। পাশাপাশি তাঁদের দাবি, যাচাইয়ের গেরোয় পড়ে যে সমস্ত প্রকৃত গরিব ও যোগ্য মানুষ কেন্দ্রীয় তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন, তাঁদের যেন অবিলম্বে রাজ্য সরকারের নিজস্ব প্রকল্পের আওতায় নতুন কার্ড দিয়ে রেশন পাওয়ার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়।