মুর্শিদাবাদ জেলায় তিনটি ‘এজেন্সি’ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। একদিকে রয়েছে নির্বাচন কমিশন ও জ্ঞানেশ কুমার, যারা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিচ্ছে, দ্বিতীয় ‘এজেন্সি’ নেতৃত্ব দিচ্ছেন অধীর চৌধুরী এবং তৃতীয়টি পরিচালনা করছেন হুমায়ুন কবীর। রেজিনগরের জনসভা থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিস্ফোরক অভিযোগ করে বলেন। তিনি দাবি করেন, মুর্শিদাবাদে নির্বাচনের আগে কিছু মানুষ সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে মাঠে নেমেছে এবং তারা আসলে বিজেপির বি ও সি টিম হিসেবে কাজ করছে। তাঁর অভিযোগ, জনগণের আবেগ নিয়ে খেলা করা হচ্ছে।
এদিন রেজিনগরের জনসভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিলেন মইনুল হক (রানা) এবং দ্রৌপদী ঘোষ।অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আরও ঘোষণা করেন, এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, ৪ মে তৃণমূল সরকার গঠনের পর তাদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সবাই দেশের নাগরিক এবং নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
তিনি ২০২১ সালের নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সেই সময়ে জেলায় ২০টি আসন তৃণমূল পেয়েছিল এবং এবার লক্ষ্য ২২–০, প্রার্থী মুসতাফিজুর রহমান,আতাউর রহমান, রবিউল আলম চৌধুরীকে বিপুল ভোটে জয়ী করুন।আসাউদ্দিন ওয়াইসি তাঁর সঙ্গে নির্বাচনে লড়বেন না। তিনি গদ্দারি করেছেন, বেইমানি করেছেন।এই প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এআই ভিডিও হলে দলের রাজ্য সভাপতি খোবায়েব আমিন পদত্যাগ করল কেন? আসাউদ্দিন ওয়াইসি হাত ছাড়ল কেন?
হুমায়ুন কবীরের ভিডিও প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্ত ছাড়া সত্যতা নির্ধারণ সম্ভব নয়। তবে তিনি অভিযোগ করেন, ওই ভিডিওতে হুমায়ুন কবীরকে বিপুল অর্থ দাবি করতে দেখা গেছে এবং তিনি ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করার চেষ্টা করেছেন। তিনি আরও দাবি করেন, হুমায়ুন তাঁর নিজের দলের কর্মীদেরও বোঝাতে পারেননি এবং পরে তিনি নিজেকে এআই-নির্মিত ভিডিও বলে দাবি করছেন।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিএসএফ ও সিআরপিএফ বিরোধীদের নিরাপত্তা দেয়, কিন্তু রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বকে সেই সুবিধা দেওয়া হয় না—এমন অভিযোগও তিনি তোলেন। ‘তৃণমূলের গ্যারান্টি লাইফটাইম ওয়ারেন্টি, বিজেপির জিরো ওয়ারেন্টি’—সাঁইথিয়ার জনসভা থেকে বিস্ফোরক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অভিযোগ, যারা বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তাদের অনেককেই পরে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
সভায় উপস্থিত সবাইকে স্বাগত জানিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, সাঁইথিয়ার সভায় নীলাবতী সাহা, কাজল শেখ, অভিজিৎ সিনহা ও চন্দ্রনাথ সিনহাসহ একাধিক প্রার্থী এবং সংগঠনের নেতৃত্ব উপস্থিত আছেন। বিজেপির ইস্তাহারে মহিলাদের জন্য তিন হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অতীতেও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি দাবি করেন, বিহারসহ বিভিন্ন রাজ্যের উদাহরণ রয়েছে যেখানে নির্বাচনের আগে টাকা দেওয়া হলেও পরে তা ফেরত চাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
তিনি দাবি করেন, তৃণমূলের গ্যারান্টি বাস্তব, আর বিজেপির প্রতিশ্রুতি ‘জিরো ওয়ারেন্টি’। তিনি বলেন, দেশে ১৫ লক্ষ টাকার প্রতিশ্রুতি, বছরে দুই কোটি চাকরি—এসবের কোনও বাস্তব ফল নেই, কিন্তু রাজ্যে সরকার এক কোটি ১২ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান করেছে বলে নাবার্ড রিপোর্টে উল্লেখ আছে।তিনি দাবি করেন, কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেই বলেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলা পরিচালিত হবে দিল্লি ও গুজরাট থেকে।
বিজেপি-সহ বিরোধীরা যখন প্রায়ই তৃণমূল নেতাদের ফুলেফেঁপে ওঠা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তখন শনিবার সাঁইথিয়ার সভা থেকে সেখানকার বিজেপি প্রার্থীর সম্পত্তিবৃদ্ধি নিয়ে তোপ দাগলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেক বলেন, ‘বিজেপি প্রার্থীর পরিবার চায়ের দোকানের সঙ্গে যুক্ত। কোথা থেকে তাঁর ১৭টি ডাম্পার হল? ঘোষিত সম্পদ ৩ কোটি টাকা হল? সেটা বোঝালে ভালো হত।’ সাঁইথিয়া কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী হিসাবে লড়ছেন কৃষ্ণকান্ত সাহা। তাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিদায়ী বিধায়ক নীলাবতী সাহা।
এরপর মেমারি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থীর হয়ে ইছাপুর প্লে গ্রাউন্ড থেকে মেমারি নতুন বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত রোড শো’ করেন তিনি।এরপর সভামঞ্চ থেকে নির্বাচন কমিশনের মুখ্য আধিকারিক জ্ঞানেশ কুমারকে তীব্র ভাষায় নিশানা করেন অভিষেক । তিনি বলেন, তাঁর মেয়াদ আর মাত্র ২৩ দিন। তারপর “টাটা বাই বাই”। তাঁর কথায়, “অনেক করেছ ভ্যানিশ কুমার। দিল্লির অনেক দাসত্ব করেছ, তল্পিবাহকের কাজ করেছ। বাংলাকে টাইট করতে এসে নিজেই টাইট হয়ে গিয়েছ।”
তিনি আরও মন্তব্য করেন, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। অভিষেকের অভিযোগ, বিজেপি গোপনে খেলে, কিন্তু তৃণমূল খেলে প্রকাশ্যে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিরোধীদের “ভোকাট্টা করে মাঠের বাইরে পাঠানো হবে”। তাঁর দাবি, চার মে-র পর পদ্মফুলের নেতাদের চোখে সর্ষেফুল দেখার মতো অবস্থা হবে।
অভিষেক আরও বলেন, বিজেপি যে টাকা দিয়ে কাজ করানোর চেষ্টা করছে, সেই টাকা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, তা বাংলার মানুষের টাকা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এখন চাপের মুখে পড়ে সেই টাকা বের করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘পদ্মফুল থেকে টাকা নিয়ে জোড়াফুলে ভোট দেবেন।‘ পাশাপাশি তিনি জানান, যে যেই ভাষা বোঝে, তাকে সেই ভাষাতেই জবাব দিতে হবে।
তিনি বলেন, এই মাটি গুজরাতের নয়, উত্তরপ্রদেশেরও নয়, এটি বীর বিপ্লবীদের বাংলা। তাঁর দাবি, যতই ভয় দেখানো হোক, যতই আঘাত করা হোক, বাংলার মানুষ ততই শক্তিশালী হবে। মানুষের অধিকার কাড়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি এবং বলেন, এর জবাব মানুষ ভোটের দিন দেবে।