রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণির মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত করতে এবং অতীত সরকারের ভুল শুধরে নিতে সোমবার বিধানসভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিল পেশ করল বিজেপি সরকার। বিধানসভায় ওবিসি আইন সংশোধনে এবং তার ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই নতুন বিলটি পেশ করেন রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ। বিলটি পেশ হওয়ার পর থেকেই বিধানসভায় এই নিয়ে শাসক ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে জোরদার বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। এই বিল পেশ হতেই ভোটাভুটির দাবি ওঠে। তখন ওয়াকআউট করেন ঋতব্রতপন্থী বিধায়করা। তবে কালীঘাট তৃণমূলের বিধায়করা বিধানসভায় বসেই ছিলেন।
এদিকে হিন্দুদের বঞ্চিত করে মুসলমানদের সংরক্ষণ দেওয়া হয়েছিল বলে গুরুতর অভিযোগ উঠল বিল পেশের পর। বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের ‘ভুল শোধরাতে’ জোড়া ওবিসি আইন সংশোধনী বিল পেশ করা হলো বিধানসভায়। বিল দু’টির নাম-‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (আদার দ্যান এসসি অ্যান্ড এসটি) রিজার্ভেশন অফ ভ্যাকেন্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্টস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ এবং ‘পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’। বিজেপি সরকারের অভিযোগ, বিগত সরকার ২০১২ সালে যখন অনগ্রসর শ্রেণি সংক্রান্ত বিলটি বিধানসভায় পাশ করিয়েছিল, তখন সেটা সম্পূর্ণ একতরফাভাবে করা হয়েছিল। সেই পুরনো আইনে রাজ্যের হিন্দু সম্প্রদায়কে সংরক্ষণের অধিকার থেকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিল এবং একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে তোষণ করার লক্ষ্যেই ওই আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল।
অন্যদিকে এই সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করে ভোটাভুটি চান আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি। তাঁর আবেদনে সম্মতি দেন বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু। এই পরিস্থিতিতে কালীঘাট তৃণমূল ভোটাভুটিতে অংশ নিলেও ওয়াকআউট করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল বিধায়করা। বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ১৮৬টি। বিপক্ষে ১৭টি। ভোটদান থেকে বিরত থাকেন ৬ জন। সুতরাং অনায়াসেই বিল পাশ হয়ে যায়। এদিন বিধানসভায় বিলটি পেশ করে অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ বলেছেন, ‘বিগত সরকারের আমলে ওবিসি তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে চরম স্বজনপোষণ এবং বঞ্চনার ঘটনা ঘটেছে। প্রকৃত অনগ্রসর শ্রেণির মানুষ, বিশেষ করে হিন্দু সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে দূরে সরানো হয়েছিল। নতুন এই সংশোধনী বিলের মাধ্যমে সেই বঞ্চনার অবসান ঘটবে।’
তাছাড়া ওবিসি সংরক্ষণের জন্য মোট ক্যাটেগরি ‘এ’-র আওতায় ৬৫টি জনগোষ্ঠী আছে। তৃণমূল জমানায় তৈরি আইনে ক্যাটেগরি ‘বি’-তে আছে ৭৮টি জনগোষ্ঠী। সেই তালিকা সম্বলিত তফশিল ওয়ান বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে নতুন বিলে। আর অনগ্রসর কমিশনে কোনও গোষ্ঠীর নাম অন্তর্ভুক্তি বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে। রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের রিপোর্ট সামনে আসার পরে রাজ্যে ওবিসি সংরক্ষণ চালু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। অনগ্রসরতার নিরিখে ‘ক্যাটিগরি এ’ এবং ‘ক্যাটিগরি বি’, এই দুই ভাগের জন্য যথাক্রমে ১০% ও ৭% সংরক্ষণ ধার্য করা হয়েছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মন্ত্রিসভার মন্ত্রী যোসগেশচন্দ্র বর্মণ ২০১০ সালে বিল পেশ করেছিলেন। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে তৃণমূলের সরকার ২০১২ সালে ওই আইন সংশোধন করেছিল।
এখানেই শেষ নয়, বিজেপি সরকারের দাবি, তারা ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ নীতিতে বিশ্বাসী। তাই ধর্মের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রকৃত সামাজিক এবং শিক্ষাগত অনগ্রসরতার ভিত্তিতেই ওবিসি শংসাপত্র প্রদান করা উচিত। এবার বিজেপি সরকারের বিলে বাম আমলের তফসিল-১ (অর্থাৎ তৃণমূল সরকারের আইনের তফসিল-২) আবার বহাল হচ্ছে তফসিল-১ হিসেবেই। আর তৃণমূল সরকারের করে যাওয়া সর্বশেষ আইনের তফসিল-১ ও ৩ তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই বিলে ২০১২ সালের আইন সংশোধন করতে চেয়ে বলা হয়েছে, অনগ্রসর কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করে রাজ্য সরকার ওবিসি-র জন্য সংরক্ষিত পদের শতাংশ হার ঠিক করবে। সময় অন্তর সংরক্ষণের অনুপাতে পদের শতাংশ বাড়ানো হতে পারে। তবে সার্বিকভাবে ৫০ শতাংশের বেশি হবে না। আর ওবিসি কমিশনের সদস্যদের মেয়াদ তিন বছরই রাখা হচ্ছে।