এসআইআরে বাদ পড়েছিল নাম। ট্র্যাইব্যুনালে আপিলপর্ব চলছে। উত্তরবঙ্গের আট জেলার সেই ছবিই প্রকাশ্যে এল আরটিআই-এর জেরে। এবং আশ্চর্যজনক বিষয় হল, যাঁদের শুনানি হয়েছে তাঁদের প্রায় সকলেরই নাম ফিরেছে তালিকায়।
বিধানসভা ভোট মিটে গিয়েছে মাস কয়েক আগে। কিন্তু বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision, SIR) প্রক্রিয়ায় যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল, উত্তরবঙ্গের সেই ১২ লক্ষেরও বেশি মানুষের ভবিষ্যৎ এখনও অন্ধকারে। আরটিআইয়ের (RTI) জবাবে উঠে আসা তথ্য বলছে, আপিলের পাহাড় জমলেও অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে (Appellate Tribunal) শুনানির গতি প্রায় থমকে।
আরটিআই-এ পাওয়া তথ্য
দক্ষিণ মালদহের কংগ্রেস সাংসদ ঈশা খান চৌধুরীর দায়ের করা আরটিআইয়ের জবাবে রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের অফিস জানিয়েছে, গত ৭ আগস্ট পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের আট জেলা থেকে মোট ১২ লক্ষ ৩৯ হাজার ৮৫১ জন এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছেন। অথচ শুনানি হয়েছে মাত্র ১৮ হাজার ৭৭০ জনের। বাকি ১২ লক্ষ ২১ হাজার ৮১ জনের আবেদন এখনও অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে।
গোটা রাজ্যের ছবিটাও প্রায় একই রকম। রাজ্যজুড়ে মোট ৩৮ লক্ষ ১০ হাজার ৬২০টি আপিলের মধ্যে ৭ আগস্ট পর্যন্ত শুনানি হয়েছে মাত্র ৮২ হাজার ৭৮২টি মামলার।
জেলাওয়াড়ি হিসেব
কোচবিহারে আবেদনকারীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৫২ হাজার ১৯৫, শুনানি হয়েছে ১ হাজার ১০৯ জনের, তার মধ্যে ৯৬৭ জনের নাম ফিরেছে আর ১৪২ জনের আবেদন খারিজ হয়েছে। জলপাইগুড়িতে ৬১ হাজার ৬৭ জনের মধ্যে শুনানি হয়েছে মাত্র ৬৬৫ জনের, তবে শুনানি হওয়া প্রত্যেকেরই নাম ফিরে এসেছে তালিকায়।
দার্জিলিঙে ৫০ হাজার ৭১২ জন আবেদন করলেও শুনানি হয়েছে মাত্র ১৬০ জনের, তার মধ্যে একজন বাদে বাকি সকলের নাম ফিরেছে। আলিপুরদুয়ারে ৪৩ হাজার ৩৫ জনের মধ্যে ২৪০ জনের শুনানিতে ২৩৭ জনের নাম ফিরেছে, বাতিল হয়েছে তিনজনের। কালিম্পঙে আবেদনকারী সংখ্যা তুলনায় কম, ৩ হাজার ৬৩৮। শুনানি হয়েছে মাত্র ২৮ জনের, প্রত্যেকেরই নাম ফিরেছে।
গৌড়বঙ্গের জেলাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়েছে মালদহে, ৫ লক্ষ ৩১ হাজার ১৪৯টি। অথচ শুনানি হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৪৭১ জনের, আর আশ্চর্যজনকভাবে তাঁদের কারও নামই বাদ যায়নি। উত্তর দিনাজপুরে ৩ লক্ষ ১২ হাজার ১৮৫ জনের আবেদনের মধ্যে ৬ হাজার ১৪১ জনের নাম ফিরেছে, বাতিল হয়েছে ৩৪০ জনের। দক্ষিণ দিনাজপুরে ৮৪ হাজার ৮৭০ জন আবেদন করেছেন, আর উত্তরবঙ্গের আট জেলার মধ্যে এখানেই আপেক্ষিকভাবে সবচেয়ে বেশি শুনানি হয়েছে, ৮ হাজার ১৬ জনের নাম ফিরেছে এবং ১০১ জনের আবেদন খারিজ হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে বাদ দেওয়ার যুক্তি নিয়েই
ঈশা খান চৌধুরীর বক্তব্য, যাঁদের শুনানি হচ্ছে তাঁদের প্রায় সকলেরই নাম যদি শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে, তাহলে ভোটের আগে প্রথমে তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার ভিত্তি ঠিক কী ছিল, সেই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের নজরে আনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মুর যুক্তি, নির্ভুলভাবে কাজ শেষ করতেই সময় লাগছে, শুনানির গতি শীঘ্রই বাড়বে বলে তাঁর আশা।
এখন কী হতে পারে
সংখ্যাগুলো স্পষ্ট বলছে, উত্তরবঙ্গে আপিলের নিষ্পত্তির হার এখনও ২ শতাংশেরও কম। ভোট মিটে গেলেও বাস্তবে যাঁদের ভোটাধিকার আটকে আছে, তাঁদের কাছে এই বিলম্ব নিছক প্রশাসনিক সমস্যা নয়, বরং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন। সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে কী নির্দেশ দেয়, তার দিকেই এখন তাকিয়ে উত্তরবঙ্গের লক্ষাধিক আবেদনকারী এবং অবশ্যই দক্ষিণবঙ্গের ভুক্তভোগীরাও।