হুমায়ুন কবীরের ভাইরাল ভিডিও ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় পড়ে গিয়েছে। আর সেই পরিস্থিতিতে শনিবার মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর থেকে তৃণমূলকে নিশানা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। হুমায়ুনের নাম সরাসরি না নিলেও তিনি সাধারণ মানুষকে ভুয়ো ভিডিও নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তাঁর দাবি, নির্বাচনের মুখে তৃণমূল পরাজয়ের আশঙ্কা দেখছে, আর সেই কারণেই বিভ্রান্তি ছড়াতে ‘ডিপফেক’ বা এআই দিয়ে ভুয়ো ভিডিও ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার করে এমন ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যা দেখে আসল ও নকল আলাদা করা কঠিন হয়ে যায়। আসাম ও পুদুচেরির নির্বাচনেও এ ধরনের ঘটনা দেখা গিয়েছে। এবার বাংলাতেও সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
Advertisement
পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী সরাসরি নাম না নিয়েও কৌশলগতভাবে ভোটারদের মনে সন্দেহ তৈরি করতে চেয়েছেন—ভাইরাল ভিডিওটি আদৌ সত্যি, না কি ভুয়ো। এর আগে অমিত শাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, প্রয়োজনে দীর্ঘদিন বিরোধিতায় থাকলেও বিজেপি হুমায়ুনের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখবে না।
Advertisement
এদিন জঙ্গিপুরের সভা থেকে অনুপ্রবেশ নিয়ে সরব হন প্রধানমন্ত্রী। বাঙালি ভাবাবেগে শান দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নীতিতে পশ্চিমবঙ্গে আজ বাঙালিরাই কোণঠাসা। মোদীর কথায়, ‘আমি কথা দিচ্ছি, বাংলায় বাঙালিদের কোনওদিন সংখ্যালঘু হতে দেব না।‘
সভা থেকে তিনি অনুপ্রবেশ ইস্যুতে সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসকে আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, অনুপ্রবেশকারীদের ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছে রাজ্যের শাসকদল। এর ফলে স্থানীয় মানুষের জমি ও চাকরির উপর প্রভাব পড়ছে বলেও দাবি করেন তিনি। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে বাঙালির নিজস্ব পরিচয় সংকটে পড়বে বলেও সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। এই নির্বাচন শুধুমাত্র সরকার পরিবর্তন নয় বরং বাংলার অস্তিত্ব ও পরিচয় রক্ষার লড়াই হিসেবেই বিষয়টিকে তুলে ধরেন। রাজ্যবাসীর উদ্দেশে তাঁর আহ্বান, সবাই একজোট হয়ে পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিন।
বিগত ১৫ বছরের শাসনকালকে তুলে ধরে তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, একসময় উন্নয়নের নিরিখে এগিয়ে থাকা রাজ্য এখন অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। সারা দেশের অর্থনীতি এগোলেও বাংলায় শিল্প ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। যুবকদের কাজের খোঁজে অন্য রাজ্যে যেতে বাধ্য হওয়ার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। একইসঙ্গে তৃণমূলের শাসনকে ‘কাট-কমিশন-করাপশন’-এর যুগ বলে কটাক্ষ করেন।
নারী সুরক্ষা প্রসঙ্গেও সরব হন প্রধানমন্ত্রী। আরজি কর ও সন্দেশখালির মতো ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজ্যে মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পাশাপাশি নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধারের ঘটনাও সামনে আনেন তিনি।
মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরে সভার পর দক্ষিণ দিনাজপুরের কুশমুণ্ডিতে জনসভা করেন মোদী। সেখান থেকে তৃণমূল সরকারকে নিশানা করতে বাঙালির প্রিয় খেলা ফুটবলকে হাতিয়ার করেন। প্রশাসনের পাশাপাশি তৃণমূল খেলাধুলার ক্ষেত্রেও ‘সিন্ডিকেট রাজ কায়েম’ করেছে বলে কটাক্ষ করেন মোদী।
কয়েক মাস আগে কলকাতায় মেসির সফর ঘিরে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, সেই ঘটনাকে সামনে এনে তিনি বলেন, যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সাধারণ মানুষ টিকিট কেটে এসেও প্রিয় ফুটবলারের দেখা পাননি। অভিযোগ ওঠে, শাসকদলের প্রভাবশালীদের ভিড়ে সাধারণ দর্শকরা বঞ্চিত হন। এই প্রসঙ্গ টেনে মোদী মন্তব্য করেন, এই ঘটনাই প্রমাণ করে কীভাবে ফুটবলও রাজনীতির শিকার হচ্ছে।
এরপর তিনি বাঙালির আবেগে—ইস্ট বেঙ্গল এবং মোহন বাগানের প্রসঙ্গ তোলেন। আরজি কর ঘটনার প্রতিবাদে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজোট হতে জানে। সেই ঐক্যকেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করার আহ্বান জানান তিনি।
নারী সুরক্ষা নিয়েও তৃণমূলকে নিশানা করেন প্রধানমন্ত্রী। সন্দেশখালি ও আরজি করের উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকারের আমলে মহিলাদের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে। তাঁর হুঁশিয়ারি, বিজেপি ক্ষমতায় এলে অতীতের সব অপরাধের তদন্ত নতুন করে শুরু হবে এবং দোষীদের কড়া শাস্তি দেওয়া হবে।
জঙ্গিপুরের সভা থেকে তৃণমূলের পাশাপাশি বামেদেরও কটাক্ষ করেন মোদী। তিনি বলেন, ‘বাংলার মানুষ বামেদের সরিয়েছিল। অনেক আশা নিয়ে মা-মাটি-মানুষের কথা শুনে তৃণমূলকে সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু তৃণমূল তো বামেদের কার্বন কপি হয়ে গিয়েছে। সব গুন্ডা তৃণমূলে চলে এসেছে। বামেদের সব দুর্নীতি তৃণমূল নিয়ে নিয়েছে। এখন তারা আবার জয়ের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু ওরা ভুলে যাচ্ছে, এটা নেতাজির মতো বীরের ভূমি। তৃণমূলের ভয়ের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ পেয়েছে বিজেপির ভরসা। তাই এ বার তৃণমূলকে বার বার বাংলা বলছে, এই সব চলবে না।’
কাটোয়ার জনসভা থেকে সভা থেকে তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল কেন্দ্রীয় জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছতে দিচ্ছে না।বিশেষ করে পিএম বিশ্বকর্মা স্কিমের প্রসঙ্গ তুলে তিনি দাবি করেন, অন্যান্য রাজ্যে বহু কারিগর প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন, কিন্তু বাংলায় তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একইসঙ্গে আয়ুষ্মান ভারত যোজনা নিয়েও বড় ঘোষণা করেন তিনি। তাঁর আশ্বাস, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিজেপি সরকার গঠন করলে প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠকেই এই স্বাস্থ্য প্রকল্প চালু করা হবে।
তবে এদিনের বক্তৃতার একটি অংশ জুড়ে ছিল মতুয়া ও শরণার্থী প্রসঙ্গ। ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় মতুয়া সম্প্রদায়ের বহু মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা প্রশমনের লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা বলে মনে করা হচ্ছে। সরাসরি বিষয়টি উল্লেখ না করলেও তিনি স্পষ্ট করেন, মতুয়ারা কারও দয়ার ওপর নির্ভরশীল নন। দেশের সংবিধান তাঁদের অধিকার সুরক্ষিত করেছে। এই প্রসঙ্গে তিনি সিএএ-এর কথা তুলে ধরে বলেন, এই আইনের মাধ্যমেই শরণার্থীদের পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে এবং নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজারহাট থেকে বনগাঁ পর্যন্ত মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে যে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতেই এই কৌশল নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। উন্নয়নমূলক প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি এবং নাগরিকত্বের আশ্বাস—এই দুই দিককে সামনে রেখেই তিনি ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন। এখন দেখার, এই বার্তা মতুয়া সমাজকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে এবং নির্বাচনে তার কী প্রতিফলন ঘটে।
Advertisement



