ভোটমুখী বাংলায় দেশের প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মালদহ স্টেশন থেকে হাওড়া-কামাখ্যা বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের সূচনা করেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব, রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস, সাংসদ ঈশা খান চৌধুরী। বন্দে ভারত স্লিপারের উদ্বোধনের পাশাপাশি ৪টি অমৃত ভারত এক্সপ্রেস ট্রেন ও ২টি এক্সপ্রেস ট্রেনেরও ফ্ল্যাগ অফ করেন প্রধানমন্ত্রী।এ দিন বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের উদ্বোধনের আগে ট্রেনটি ঘুরে দেখেন তিনি। কথা বলেন এই ট্রেনের চালকদের সঙ্গে। স্কুলের কচিকাঁচারাও উপস্থিত ছিল ট্রেনে। তাদের সঙ্গেও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
মোদী এদিন বলেন, ‘আজ থেকে বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন চালু হল। আপনাদের যাত্রা আরও সহজ, আনন্দদায়ক হল। আমি মালদহ স্টেশনে ট্রেনে বসে যাত্রীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁরা ট্রেনে বসেই দারুণ আরাম উপভোগ করছেন বলে আমাকে জানিয়েছেন। এই ট্রেন মেড ইন ইন্ডিয়া, এতে মিশে রয়েছে প্রতি ভারতীয়ের শ্রমের ঘাম। দেশের আধুনিক রেল পরিষেবার সুবিধা পাবেন বাংলার মানুষ। আরও চারটি অমৃত ভারত ট্রেন ছাড়বে বাংলা থেকে।‘
বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের উদ্বোধনের পরে মোদী বাংলায় ‘আসল পরিবর্তন’-এর ডাক দেন। ওড়িশা, ত্রিপুরা, বিহার এবং আসামের প্রসঙ্গ উত্থাপন বাংলায় সুশাসনের সময় এসে গেছে বলে জানান তিনি। আর এই পরিবর্তন আনতে জেন জি পাশে আছে বলেও প্রত্যয় প্রকাশ করেন মোদী। মহারাষ্ট্রের বিএমসি নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গ টেনে এনে একথা এদিন বলেন মোদী। ‘পাল্টানো দরকার’-এর মতো স্লোগান এদিন তাঁকে দিতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘মালদহে রাজনীতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন রয়েছে। মালদহ বাংলার সমৃদ্ধির এক কেন্দ্র। এখানে আসল পরিবর্তনের জন্য মানুষের চোখে বিশ্বাস দেখতে পাচ্ছি। আমি বিহার ভোটে জয়ের পরেই বলেছিলাম, মা গঙ্গার আশীর্বাদে এ বার বাংলায়ও বিকাশের গঙ্গা বইবে। বিজেপি এই কাজ করেই ছাড়বে।’
তৃণমূলকে নিশানা করে মোদী বলেন, ‘ওড়িশা, ত্রিপুরা, আসামে বিজেপি সরকারের উপরে ভরসা রেখেছেন মানুষ। কিছু দিন আগে বিহারেও আরও একবার বিজেপির এনডিএ সরকারে এসেছে। অর্থাৎ বাংলার চার দিকে বিজেপির সুশাসনের সরকার আছে। এ বার বাংলায় সুশাসনের সময়।’ তৃণমূল গরিব মানুষের প্রকল্পের টাকা লুট করে বলে আক্রমণ শানায় প্রধানমন্ত্রী। তৃণমূলকে ‘গরিবের শত্রু’ বলে এ দিন উল্লেখ করেন তিনি। ‘এই নির্দয় সরকারের বাংলা থেকে বিদায় দরকার’ বলে মত প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বেলডাঙায় আক্রান্ত মহিলা সাংবাদিক নিগ্রহের প্রতিবাদ করে তিনি বলেন,‘একজন মহিলা সাংবাদিককে এভাবে মারা হল। তৃণমূলের গুন্ডারাই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এই পরিস্থিতি বিজেপি ছাড়া আর কে বদল করবে?’ বেলডাঙা পরিস্থিতির পাশাপাশি মোদী এদিন ফের অনুপ্রবেশ ইস্যু নিয়ে সরব হন। তিনি বলেন, ‘মালদহ-মুর্শিদাবাদে অনুপ্রবেশকারীরা দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা করছে। মহিলা সাংবাদিকের উপর হামলা করা হয়েছে। তৃণমূলের এই অত্যাচার শেষ হবে একদিন, পতন ঘটবে। বাংলায় বিজেপি সরকার এলে অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।’
প্রধানমন্ত্রী অনুপ্রবেশ নিয়ে বলেন, ‘যেসব দেশে টাকার অভাব নেই, সেসব উন্নত দেশও অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দিচ্ছে। এ দেশ থেকে কি বের করা হবে না? তৃণমূল তো এদের সাহায্য করছে। এরা কি আপনার ক্ষতি করছে না? বিজেপি এলে অনুপ্রবেশকারীদের তাড়াবে। বড় অ্যাকশন নেবে।‘ এরপর ফের সরাসরি তৃণমূলকে নিশানা করে তাঁর মন্তব্য, ‘আপনাদের ভোটে বাংলায় বিজেপি আসবে, প্রতি কোণায় পদ্ম ফোটাতে হবে। ভাজপা কার্যকর্তাদের আমি বলতে চাই, তৃণমূলের তাণ্ডব শেষ হবে একদিন। রাজনীতিও শেষ হবে। আপনারা অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবেন।‘
এসআইআর তালিকায় বহু মতুয়ার নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এদিন মালদহ থেকে মতুয়াদের অভয়বাণী দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি এদিন বলেন, ‘মোদীর গ্যারান্টি, মতুয়া, যাঁরা প্রতিবেশী দেশে ধর্মের কারণে হিংসার শিকার হয়ে এখানে এসেছেন, তাঁরা ভয় পাবেন না। মোদী সিএএ-র মাধ্যমে শরণার্থীদের সুরক্ষা দিয়েছে। এখানে যে বিজেপি সরকার হবে, তারা মতুয়া, নমঃশূদ্র শরণার্থীদের বিকাশের কাজে গতি আনবে। বাংলায় পরিবর্তন আনার দায়িত্ব রয়েছে মা-বোন, যুবকদের।’
উল্লেখ্য, উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ায় মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস বেশি। এছাড়াও রাজ্যের আরও অন্যান্য জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে রয়েছেন মতুয়ারা। বনগাঁ, রানাঘাট লোকসভা কেন্দ্রে বড় অংশের মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের ভোটাধিকার রয়েছে। মতুয়াদের আশঙ্কা, এসআইআরের ফলে অনেকেই নাগরিকত্ব হারাতে পারেন। ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও মতুয়া, নমঃশূদ্রদের অনেকেই এখনও নাগরিকত্ব পাননি।
এই পরিস্থিতিতে বিজেপি নেতাদের একাংশের মুখে বারবার বাংলাদেশে ‘পুশব্যাকে’র কথা শোনা গিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, যার ফলে বিজেপির উপর থেকে আস্থা হারিয়েছেন মতুয়ারা। আর সে কারণেই সম্ভবত চাপে রয়েছে গেরুয়া শিবির। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বনগাঁর সাংসদ শান্তনু ঠাকুর বারবার মতুয়া উদ্বাস্তুদের সিএএ-এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলেন। সেই একই আশ্বাসের সুর শোনা গেল মোদীর গলাতেও।
গত বছর ২০ ডিসেম্বর নদিয়ার তাহেরপুরে সভা ছিল প্রধানমন্ত্রীর। সেই দিন নরেন্দ্র মোদীর মুখে মতুয়া নিয়ে একটি কথাও শোনা যায়নি। যা নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে। যদিও সে দিন কুয়াশার জন্য তাহেরপুর যেতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী। দমদম বিমানবন্দর থেকে ভার্চুয়াল সভা করেন। তবে শনিবার মালদহ থেকে মতুয়াদের নাগরিকত্ব নিয়ে অভয় দেন মোদী। সিএএ-এর মাধ্যমে তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। যাঁরা ধর্মীয় হিংসার শিকার হয়ে ভিন দেশ থেকে ভারতে এসেছেন তাঁদের আশ্বস্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।