Explained: কোনও রাজ্যে রোজ ডিম, কোথাও ডিম নিষিদ্ধ: মিড ডে মিলের মানচিত্রে বাংলায় এত বিতর্ক কেন?

মিড ডে মিলে ডিম-বিতর্ক (AI নির্মাণ)

উত্তর ২৪ পরগনার সোদপুর নিউ কলোনি স্কুল। গরম ভাত আর আলু-সোয়াবিনের তরকারি থালায় পড়েছে। ছোট ছেলেটা মুখ বাড়াচ্ছে, কিন্তু খাচ্ছে না। রান্নার দিদিকে বলছে, ‘ডিম দাও।’

ডিম আসে সপ্তাহে মাত্র একবার।

এই একটাই ডিমের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকে বাংলার সরকারি স্কুলের পড়ুয়ারা। আর সেই একটুকুও এখন অনিশ্চিত।


২২ জুন, ২০২৬। রাজ্য বিধানসভায় বাজেট পেশ করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত জানালেন, কলকাতা পুরসভা এলাকার স্কুলগুলিতে মিড ডে মিল রান্নার দায়িত্ব পাচ্ছে ইসকন (ISKCON)। প্রতি পড়ুয়ার বরাদ্দ বাড়বে, ৬.৭৮ টাকা থেকে হবে ১০ টাকা। কিন্তু ইসকন রান্না করলে মেনু হবে সম্পূর্ণ নিরামিষ। ডিমের কোনও জায়গা নেই সেখানে।

ব্যস। শুরু প্রবল বিতর্ক। কিন্তু তা কি সত্যিই খুব যুক্তিসঙ্গত?

ডিম মানেই রাজনীতি?

তামিলনাড়ুতে (Tamil Nadu) সরকারি স্কুলের পড়ুয়ারা প্রতিদিন ডিম পায়। অন্ধ্রপ্রদেশে (Andhra Pradesh) সপ্তাহে পাঁচ দিন। তেলেঙ্গানায় (Telangana) এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে (Andaman and Nicobar Islands) তিন দিন। কর্ণাটক (Karnataka) ২০২৪ সালে সরকার ঘোষণা করেছে, সপ্তাহে ছয় দিন ডিম দেওয়া হবে। ঝাড়খণ্ড (Jharkhand), ওড়িশা (Odisha), ত্রিপুরা (Tripura) দেয় সপ্তাহে দুই দিন। বিহার (Bihar), কেরলম (Keralam), মিজোরাম (Mizoram), উত্তরাখণ্ড (Uttarakhand) দেয় সপ্তাহে একবার।

আর গুজরাত (Gujarat), রাজস্থান (Rajasthan), মধ্যপ্রদেশ (Madhya Pradesh), উত্তরপ্রদেশ (Uttar Pradesh) ডিম দেয় না। ঘটনাক্রমে এই রাজ্যগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি (BJP) ক্ষমতায়।

২০২৫-২৬ সালে সারা দেশে মাত্র ১৩টি রাজ্য স্কুলের পাতে ডিম রাখছে। এক দশক আগে সংখ্যাটা ছিল ১৬। ফলও কমেছে, ডিমও কমেছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির (Parliamentary Standing Committee) পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রকল্পটা ক্রমশ ক্যালোরির হিসেব মেলাচ্ছে, পুষ্টির নয়।

কেন্দ্র বলে দেয় না, ডিম দিতেই হবে

পিএম পোষণ (PM POSHAN) প্রকল্পের নির্দেশিকায় ডিম বাধ্যতামূলক নয়। কেন্দ্র শুধু বলে, প্রাথমিকের পড়ুয়ারা যেন পান ৪৫০ ক্যালোরি এবং ১২ গ্রাম প্রোটিন। কী খাইয়ে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করবে, সেটা রাজ্যের সিদ্ধান্ত।

অভিযোগ, আর এই ফাঁকটাই ব্যবহার করে আসছে বিভিন্ন সরকার।  পুষ্টির নামে রাজনীতির পছন্দ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্কুলের থালায়।

ইসকনের পুরনো বিতর্ক

ইসকন বা তাদের সহযোগী অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশন (Akshaya Patra Foundation) কর্ণাটক এবং ওড়িশায় মিড ডে মিল সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েছিল। সেখানে ডিম, পেঁয়াজ, রসুন বাদ দেওয়া হয়েছিল সংগঠনের ধর্মীয় খাদ্যাভ্যাসের নিয়মে। খাদ্যের অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।

রাজস্থানে সংগঠনটি বলেছিল, ডিম ‘অনুমোদনযোগ্য নয়’। চণ্ডীগড়ে পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া খাবার পড়ুয়ারা খেতে পারেনি বলে ইসকনকে চুক্তিই দেওয়া হয়নি। ২০১৫ সালে ভারতের নিয়ন্ত্রক ও মহাহিসাবপরীক্ষকের (Comptroller and Auditor General of India) রিপোর্ট জানিয়েছিল, ইসকনের ১৮৭টি খাদ্য নমুনা নির্ধারিত মানে পৌঁছায়নি। ৭৫ শতাংশ পড়ুয়া এবং শিক্ষকের মতামত ছিল নেতিবাচক।

অন্ধ্র, তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক এবং আসামে শ্রমিক আন্দোলনের চাপে ইসকনকে মিড ডে মিলের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হয়েছিল। বাংলায় কী হবে, সময় বলবে।

৯৯ শতাংশ মাছ খাওয়া বাংলায় সাত্ত্বিকথালা

পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (National Family Health Survey) অনুযায়ী বাংলার ৯৮ শতাংশ মানুষ মাংস খান, ৯৯ শতাংশ মাছ। দেশের বড় রাজ্যগুলির মধ্যে আমিষ খাবারে খরচের হিসেবে বাংলা শীর্ষে। মোট খাদ্য বাজেটের ২০ শতাংশ যায় আমিষে। গুজরাটে সেটা মাত্র ২ শতাংশ।

এই বাংলায় সরকারি স্কুলের পাতে ইসকনের ‘সাত্ত্বিক’ মেনু, তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংঘাত কতটা গভীর হতে পারে সেটা রাজনীতিকরা টের পাচ্ছেন। রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন (Derek O’Brien) প্রকাশ্যে বলেছেন, ভোটের আগে মাছ-খাওয়ার প্রদর্শনী করেছে বিজেপি, ভোটের পরে বাচ্চাদের পাত থেকে ডিম তুলে নিচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পাল্টা জবাব, ‘ইসকনের রান্নাঘর থেকে ভালো, পরিষ্কার খাবার পাবে ছেলেমেয়েরা।’

কিন্তু মহেশতলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেবব্রত পান্তি জানাচ্ছেন, যে দিন থালায় ডিম থাকে, সে দিন পড়ুয়াদের উপস্থিতি বেশি থাকে। ডিমের আশায় স্কুলে আসে বাচ্চারা। ডিম সরিয়ে দিলে সেই হাজিরার হিসেবও কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটা ভাবার সময় এখনই।

রাঁধুনির ভবিষ্যৎ

মিড ডে মিলের রাজনীতিতে যে বিষয়টা সবচেয়ে কম আলোচিত, সেটা হল রাঁধুনিদের জীবিকা। কলকাতায় এই মুহূর্তে প্রায় চার হাজার মহিলা মিড ডে মিল রান্নার কাজ করেন। ইসকনের কেন্দ্রীয় রান্নাঘর চালু হলে এই মহিলাদের বেশিরভাগই কাজ হারাবেন। মিড ডে মিল ওয়ার্কার্স ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (Mid-Day Meal Workers Federation of India) প্রতিবাদে সরব হয়েছে।

থালায় ডিম না থাকলে কী হয়

দেশের ১২ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩৫.৫ শতাংশ খর্বকায়, ৩২.১ শতাংশ কম ওজনের, ১৯.৩ শতাংশ মারাত্মক পুষ্টিহীন। একটা ডিমে থাকে ৬.৩ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন এবং নয়টি অত্যাবশ্যক অ্যামিনো অ্যাসিড। কলকাতার পুষ্টিবিদ সঞ্চিতা শীল বলছেন, সোয়া চাঙ্কস বা রাজমা দাল দিয়ে ডিমের পুষ্টিমূল্য পুরোপুরি পূরণ করা কঠিন। দুধ, ছানা বা দই না মিললে ভেজিটেরিয়ান প্রোটিনের ঘাটতি থেকেই যায়।

এক ডিম, অনেক হিসেব

ডিম একটা খাদ্যবস্তু মাত্র নয়। ভারতের মিড ডে মিলের ইতিহাসে ডিম হল একটা পরিমাপক। ধর্মীয় খাদ্যাভ্যাসের পছন্দ যেখানে সরকারি স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণ করে ফেলে, সেখানে প্রান্তিক পরিবারের শিশুরাই সবচেয়ে বড় মূল্য চোকায়।

তামিলনাড়ু প্রতিদিন ডিম দেয়, কারণ সে রাজ্যের সরকার বিজ্ঞানের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। বাংলায় ৯৯ শতাংশ মানুষ মাছ খান, অথচ সরকারি স্কুলের পাতে এখন সপ্তাহের একটি ডিমও থাকবে কিনা, সেটা নিশ্চিত নয়। তবে ডিমের  বদলে দুধ, ছানা বা দই থাকলে অবশ্যই তা দিয়ে উপযুক্ত পুষ্টি মিলতেই পারে। সেটা সম্ভব কি না, তা সময়ই বলবে।