চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষজন। এসআইআর নিয়ে শুনানির নোটিস হাতে পাওয়ার পর থেকেই এই আতঙ্ক বেড়েছে। তাঁদের হাতে নেই নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নথি। সেজন্য ভোটাধিকার হারানোর ভয় এবং বাংলাদেশে পুশব্যাকের আশঙ্কা ক্রমশ গ্রাস করছে তাঁদের। এই পরিস্থিতিতেই উত্তর ২৪ পরগনার বাগদায় এক শুনানি কেন্দ্রে সিএএ ফর্ম ফিলাপ করার ‘পরামর্শ’ দেওয়াকে ঘিরে চরম উত্তেজনা ছড়িয়েছে। অভিযোগের আঙুল উঠেছে কেন্দ্রের এক নির্বাচনী আধিকারিকের বিরুদ্ধে।
প্রসঙ্গত, মতুয়া গড় হিসেবে পরিচিত বাগদা বিধানসভা এলাকায় মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশই মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের অনেকেই গত ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে স্থায়ীভাবে এই এলাকায় বসবাস করছেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাগদা কেন্দ্রে মৃত, শিফটিং ও নিখোঁজ ভোটারের সংখ্যা ২৪ হাজার ৯২৩। ইতিমধ্যেই শুনানির নোটিস পাঠানো হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৮০ জনকে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই তালিকার অধিকাংশই মতুয়া ভোটার।
অভিযোগ, কমিশনের নির্ধারিত নথি দেখাতে না পারলে ভোটাধিকার বাতিল হয়ে যেতে পারে— এই আশঙ্কায় কার্যত দিশেহারা মতুয়ারা। অনেকেই নাগরিকত্ব পাওয়ার আশায় ঠাকুরবাড়ির ক্যাম্প থেকে সিএএ–র আবেদন করেছেন। কিন্তু আজও নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট পাননি। ফলে একদিকে ভোটাধিকার হারানোর ভয়, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা— দুইয়ের চাপে উদ্বিগ্ন তাঁরা।
মঙ্গলবার বাগদার হেলেঞ্চা গার্লস স্কুলে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। ওই স্কুলে শুনানি কেন্দ্রের ডিউটিতে থাকা বাগদা বিডিও দপ্তরের কর্মী তাপস বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি শুনানিতে আসা কয়েকজন মতুয়া ভোটারকে সিএএ ফর্ম ফিলাপ করার পরামর্শ দেন। আশারু পঞ্চায়েতের হামকুড়ো এলাকা থেকে শুনানিতে আসা কমলেশ ঢালি ও দীপক ঢালির দাবি, নথি জমা দিতে গেলে ওই পরামর্শ দেওয়া হয়।
এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই শুনানি কেন্দ্রে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছন তৃণমূল কর্মীরা। ক্ষিপ্ত মতুয়া ভোটাররা অভিযুক্ত আধিকারিককে দীর্ঘক্ষণ কেন্দ্রের ভিতর আটকে রেখে বিক্ষোভ দেখান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাগদা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়।
ঘটনাটি নিয়ে সরব হয়েছে তৃণমূলও। তৃণমূল প্রভাবিত অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক সুকেশ চন্দ্র চৌধুরী বলেন, একজন সরকারি আধিকারিক হয়ে এ ধরনের পরামর্শ দেওয়ার কোনও অধিকার তাঁর নেই। সিএএতে আবেদন করেও যদি নাগরিকত্ব না মেলে, তার দায় কি ওই আধিকারিক নেবেন?
তৃণমূলের বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি বিশ্বজিৎ দাসের অভিযোগ, বিজেপি কমিশনের আধিকারিকদের মাধ্যমে সিএএ নিয়ে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। যদিও স্থানীয় বিজেপি নেতা অমৃতলাল বিশ্বাসের বক্তব্য, কমিশনের ওই আধিকারিক ঠিক কাজই করেছেন। অন্যদিকে, বাগদার বিডিও বলেন, পুরো বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছে। ওই কর্মী এমন কোনও কথা বলেননি।
সব মিলিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে মতুয়া অধ্যুষিত বাগদায় নতুন করে উদ্বেগ ও রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। ভোটাধিকার ও নাগরিকত্বের প্রশ্নে এই অনিশ্চয়তা আগামী দিনে আরও বড় আকার নিতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।