হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসে ন্যাপথা পাইপলাইনে ভয়াবহ আগুন, আহত ২২, মৃত ১

Image: ANI

হলদিয়ায় পেট্রোকেমিক্যালসের ন্যাপথা পাইপলাইনে ভয়াবহ আগুন। মঙ্গলবার ভোর ৪টে নাগাদ হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের ন্যাপথা বহনকারী পাইপলাইনে আচমকাই আগুন লেগে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে হলদিয়া পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের চিরঞ্জীবপুরে। আগুন নিয়ন্ত্রনে দমকলের একাধিক ইঞ্জিন এসে উপস্থিত হয় ঘটনাস্থলে। জল ও ফোম দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়।

এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের জেরে ২২ জন আহত হয়েছেন বলে সূত্রের খবর। ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৩৮ বছরের এক মহিলার। মানু বিবি নামে ওই মহিলা রেললাইন সংলগ্ন বস্তির বাসিন্দা বলে জানা গিয়েছে। ঘটনায় আহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে জানানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে ৬ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের গ্রিন করিডোর করে কলকাতায় স্থানান্তর করা হয়েছে। কলকাতার এসএসকেএম ও এনআরএসে আহতরা চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

আগুন লাগার খবর পেতেই সকালে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী হলদিয়ার বিধায়ক প্রদীপ বিজলিকে ফোন করে পরিস্থিতির খোঁজ খবর নেন। তবে দুর্ঘটনার কারণ সঠিকভাবে জানা যায়নি। অগ্নিকাণ্ডের পাশে একটি স্থানীয় বস্তি এলাকা রয়েছে। সেই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, সোমবার বিকেল থেকেই পাইপলাইন থেকে ন্যাপথা লিক হয়েছে। বিষয়টি তারা পেট্রোকেমিক্যালস কতৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু কতৃপক্ষের তরফে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।


এরপর ভোরের দিকে বৃষ্টি হলে ওই সময় বজ্রপাতও হয়। আর তার জেরেই আগুন লেগে থাকতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। আগুনের গ্রাসে চলে যায় বস্তির একাধিক বাড়ি। মৃত্যু হয়েছে এক মহিলারও। ঘটনায় আহতদের সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন হলদিয়ার বিধায়ক। ঘটনায় গৃহহীনদের জন্য কয়েকটি ত্রাণ শিবির চালু করা হয়েছে। সেই সঙ্গে আহতরা যাতে সঠিক চিকিৎসা পান সে দিকে নজর রাখা হচ্ছে।

পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসক নীরঞ্জন কুমার জানান, ‘হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনার পর অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান শুরু করেছে।’  প্রাথমিকভাবে পাইপলাইনে লিক থেকেই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছে সংস্থা। যদিও ঘটনার সঠিক কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে সংস্থা।

এলাকার বিধায়কেরও প্রাথমিক অনুমান, পাইপলাইনে লিক থেকেই আগুন লাগতে পারে। তবে তাঁর বক্তব্য, ‘এই ধরনের পাইপলাইনে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ থাকায় লিক হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। পাইপলাইনগুলিতে মোটরবাইকে টহল দেন নিরাপত্তারক্ষীরা এবং নিয়মিত নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ হয়। তা সত্ত্বেও কখন কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়।’ তাঁর দাবি আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে প্রায় আধ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।‘

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে পেট্রোকেমিক্যালস সংস্থা একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, কারখানা লাগোয়া একটি জায়গায় দুর্ঘনাটি ঘটেছে। দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই একটি জায়গাকে ন্যাপথা চুরির সম্ভাব্য এলাকা বলে চিহ্নিত করেছে সংস্থা। ন্যাপথা অত্যন্ত দাহ্য এবং বিপজ্জনক হাইড্রোকার্বন। সেকারণে  নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এড়াতে অনুমোদনহীন উপায়ে পেট্রোপণ্য সংগ্রহ না করার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের বার বার সতর্ক করা হয়েছে। সংস্থার আরও একটি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, পাইপ লিক করার কারণেই আগুন লেগেছে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ চিকিৎসা সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে সংস্থার তরফে।
হলদিয়ার যে এলাকায় এদিন আগুন লেগেছে সেই এলাকার একেবারে পাশ দিয়েই গিয়েছে রেললাইন। আগুনের তীব্রতা এতটাই যে ওভারহেড লাইন সম্পূর্ণ পুড়ে গিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ট্রান্সফর্মারও। স্থানীয়দের দাবি, আগুনের তীব্রতায় লাইনের বেশ কিছু অংশও দুমড়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতির জেরে ওই লাইনে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা রাখা হয়েছিল ট্রেন চলাচল। বাতিল করা হয়েছে হলদিয়া-হাওড়া লোকাল ট্রেনটিকে। রুটও বদল করা হয়েছে ট্রেনের। জানা গিয়েছে, হলদিয়ার বদলে দুর্গাচক পর্যন্ত চালানো হয়েছে ট্রেনটিকে। যদিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে ছুটে যান রেলের আধিকারিকরা। কিন্তু আগুনের তীব্রতায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় তাঁদের।

ঘটনা প্রসঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার অংশুমান সাহা জানান, ‘মঙ্গলবার ভোরে ন্যাপথার পাইপলাইনে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পুলিশ ও দমকল যৌথভাবে উদ্ধার এবং আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে।’ পুলিশ সুপার আরও জানান, ‘কয়েকজন আহতকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর স্থানীয় হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কয়েকজন এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তমলুক স্থানান্তরিত কয়েকজনকে পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য কলকাতার হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যারিকেড করা হয়েছে।’