আরজি কর মামলায় মমতার ভূমিকা, অভিষেকের লিপ্‌স অ্যান্ড বাউন্ডসের সম্পত্তি নিয়ে নিশানা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

আরজি করের তরুণী চিকিৎসক ধর্ষণ ও খুনের মামলাকে সামনে রেখে ফের তীব্র আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী  শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক  অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তি নিয়েও সরব হন তিনি। শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার সফরে গিয়ে শুভেন্দু স্পষ্ট ভাষায় জানান, আরজি কর কাণ্ড এবং দুর্নীতির অভিযোগ— দুই ক্ষেত্রেই তিনি ‘শেষ দেখে ছাড়বেন’।তাঁর অভিযোগ, আরজি করে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ, খুনের ঘটনায় মূল অভিযুক্তদের আড়াল করার চেষ্টা করেছিল পূর্বতন সরকার। অন্য দিকে, তৃণমূল সরকারে থাকার সুবাদে সাংসদ অভিষেকের হিসাব-বহির্ভূত সম্পত্তি বৃদ্ধি নিয়েও এদিন সরব হন শুভেন্দু অধিকারী।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এদিনই ছিল তাঁর প্রথম জেলা সফর। আগামী ২১ মে ফলতা বিধানসভায় পুনর্নির্বাচনের আগে সেখানে রাজনৈতিক সভা করেন শুভেন্দু। তার আগে ডায়মন্ড হারবারে পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকও করেন তিনি। সেখান থেকেই ঘোষণা করেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে গঠিত পুলিশ ওয়েলফেয়ার বোর্ড ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।

সভায় শুভেন্দুর মূল নিশানায় ছিল আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা। তাঁর অভিযোগ, তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় প্রকৃত তথ্য গোপন করার চেষ্টা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, প্রাক্তন সরকারের নির্দেশেই প্রমাণ লোপাট এবং ভুক্তভোগীর পরিবারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।


সম্প্রতি তিন আইপিএস আধিকারিককে সাসপেন্ড করার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘অভয়ার ঘটনায় আগের মুখ্যমন্ত্রীর ইশারায় এবং কথায় যাঁরা যাঁরা অত্যাচার করেছেন, প্রমাণ লোপাট করেছেন, অভয়ার মাকে আগের হেরো মুখ্যমন্ত্রীর কথায় যাঁরা ঘুষ দিতে গিয়েছিলেন, সেই তিন আইপিএস সাসপেন্ড হয়েছেন। এ জেলাতেও ছাড়া হবে না। বিজেপি প্রার্থী বিশ্বজিৎ পালকে প্রকাশ্যে মেরেছিল। বারুইপুরের আইসি সাসপেন্ড। ক্যানিংয়ে বিজেপি কর্মীর উপর অত্যাচার করেছিল। আইসি অমিত হাতি সাসপেন্ড।’

শুভেন্দু আরও বলেন, ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার আধিকারিকদের কল রেকর্ড ও হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট জমা দিতে বলা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ,  ‘ভাইপোর পিএ-র নির্দেশে ফলতা, ডায়মন্ড হারবার তথা দক্ষিণ ২৪ পরগনায় অত্যাচার করেছেন, সব বার করব।’ সেই সময় আবার আরজি কর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘বিনীত গোয়েল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, অভিষেক গুপ্তদের কল রেকর্ড, চ্যাট যখন তদন্তকারীর সামনে আনবেন, সে দিন দেখতে পাবেন, আগের সরকারের কুকীর্তি। কত নিচে নেমেছিলেন।’

অন্যদিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তি নিয়েও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, কলকাতায় ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’-এর নামে একাধিক সম্পত্তির তথ্য তাঁর হাতে এসেছে। আমতলায় বিশাল অফিসের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘মাননীয় ভাইপোবাবু, কাল প্রপার্টির লিস্ট আনালাম কলকাতা কর্পোরেশন থেকে। আপনার লিপস্ অ্যান্ড বাউন্ডসে্‌র ২৪টি প্রপার্টি কলকাতায়।

আমতলায় প্রাসাদের মতো অফিস। হিসাব হবে।’ যদিও এই সমস্ত অভিযোগ আগেও একাধিক বার অস্বীকার করেছেন অভিষেক। নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ সংস্থার নাম উঠে এলেও তৃণমূল বরাবর দাবি করেছে, দলের সঙ্গে ওই সংস্থার কোনও সম্পর্ক নেই।

সভা থেকে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের অভিযোগও তোলেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, গত কয়েক বছরে ফলতা-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বহু মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেননি। এ বার শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন তিনি। পাশাপাশি অভিযোগ করেন, সরকারি প্রকল্পে কাটমানি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অত্যাচার এবং মহিলাদের উপর নির্যাতনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশকে সমস্ত অভিযোগ গ্রহণ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।

শুক্রবার বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে হওয়া কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা বলি না, চার তারিখ ফলঘোষণার দিন দুপুর ১২টার পর ডিজে বাজবে। আমাদের রাজ্য সভাপতি বলেন, অভিনন্দন যাত্রা করুন। অনিচ্ছুকের গায়ে আবির দেবেন না।এটাই বিজেপি।’ অভিষেককে উদ্দেশ্য করে শুভেন্দু বলেন, ‘আপনারা কী করেছেন আমরা জানি না?

পুলিশকে ব্যবহার করে ২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর আমার সভায় আসা লোকগুলোকে কী ভাবে মেরেছিলেন! আমি ভুলিনি।’  মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, ‘পৃথিবীটা গোল। চিরদিনই কাহারো সমান নাহি যায়। ভুলব কী করে এগুলো। মানুষ তো শুধু চেয়ারে বসিয়ে দেয়নি। মানুষ বিচার চেয়েছে। এটা শুধু নামের বদল নয়, রঙের বদল নয়, এটা দ্বিতীয় স্বাধীনতা বাংলার, গোটা বাংলা নাচছে।’

অভিষেক-ঘনিষ্ঠ ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, গত ১০ বছর ফলতার মানুষজন লোকসভা, বিধানসভা এবং পঞ্চায়েত ভোট দিতে পারেননি। এ বার তার হিসাব হবে। তাঁর কথায়, ‘ফলতায় আসার পথে কুড়ি জায়গায় দাঁড়িয়েছি। একটাই প্রশ্ন ছিল আমার। কত দিন ভোট দিতে পারেননি? সকলে বলল, ভাইপো যত দিন এসেছে তত দিন ভোট দিতে পারিনি’

অন্যদিকে, শুভেন্দুর বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তৃণমূল নেতা  কুণাল ঘোষ। তাঁর দাবি, আরজি কর মামলায় যাকে প্রথমে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল, তদন্তে সিবিআইও এখনও পর্যন্ত তার বাইরে নতুন কাউকে চিহ্নিত করতে পারেনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘তাহলে কি এখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কিছু পদক্ষেপ করা হচ্ছে?’ একই সঙ্গে তিনি জানান, ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ সংক্রান্ত বিষয়ে তৃণমূলের আনুষ্ঠানিক কোনও মন্তব্য নেই।