নির্বাচনী বিধি জারি হওয়ার পর থেকেই রাজ্য প্রশাসনে একের পর এক রদবদল হয়েই চলেছে। তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। একই দিনে ২৬৭ জন আধিকারিকের বদলি করেছে নির্বাচন কমিশন। গত ১৫ দিনে এই ব্যাপক প্রশাসনিক পরিবর্তন ঘিরে হাইকোর্টে মামলাও দায়ের হয়েছে। সোমবার নারায়ণগড়ের জনসভা থেকে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তিনি বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে কটাক্ষ করে প্রশ্ন তোলেন— মানুষ যদি সত্যিই তাদের ভালোবাসে, তবে এত ভয় কেন? কেন প্রশাসনে হস্তক্ষেপ ও বিভাজন? তাঁর অভিযোগ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ আধিকারিকদের সরিয়ে দিয়ে প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে ভাগ করা হচ্ছে। আইপিএস, আইএএস থেকে শুরু করে রাজ্য পুলিশ— সর্বত্রই পক্ষপাতিত্ব চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
মমতা বলেন, ‘প্রশাসনে ভাগাভাগি আগে কোনও দিন ছিল না। যারা কাজ করত, আমাদের অ্যাসেট— এরকম ভালো ভালো অফিসারদের সরিয়ে দিচ্ছে। এত স্বৈরাচার-অনাচার আমি জীবনে দেখিনি। আইপিএস-আইএএস-এ ভাগাভাগি, রাজ্য পুলিশে ভাগাভাগি। কে আরএসএস করে, কে বিজেপি করে, কে বিজেপির আত্মীয় তাই খুঁজছে। নিজেদের পুলিশ-লোক নিয়ে এনে ভাবছো তৃণমূলকে জব্দ করবে! এতে উল্টো প্রতিক্রিয়া হবে। লোক একটা ভোটও দেবে না।’
এসআইআর নিয়ে কমিশনকে নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ ,‘ওরা বলছে চারটে তালিকা নাকি বেরিয়ে গিয়েছে। একটাও চোখে দেখতে পাইনি। চক্রান্ত চলছে। ষড়যন্ত্র করে আদিবাসী-সংখ্যালঘুদের নাম বাদ দিয়েছে। ওদের টার্গেট বাংলাকে বাদ দাও।’ মমতার কথায়, ‘বিজেপির কথায় কমিশন বেছে বেছে বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে বাদ দিয়েছে। যদিও ওদের জেতার কোনও সম্ভাবনা নেই।’
একইসঙ্গে সম্প্রতি অমিত শাহের তৃণমূলের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, আসলে প্রথম চার্জশিট হওয়া উচিত নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে। সরকারি প্রকল্প নিয়েও বিরোধীদের সমালোচনার জবাব দেন তিনি। ‘যুবসাথী’, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’ ইত্যাদি প্রকল্পকে ভাতা নয়, বরং মানুষের সম্মানের সঙ্গে বাঁচার সহায়ক উদ্যোগ বলে উল্লেখ করেন তৃণমূল সুপ্রিমো। তাঁর মতে, এই প্রকল্পগুলির ফলে পরিবারগুলোর আর্থিক সুরাহা হচ্ছে, বিশেষত মেয়েদের ক্ষমতায়ন ঘটাচ্ছে।
এদিন দলীয় কর্মীদের প্রতিও কড়া বার্তা দেন তিনি। নারায়ণগড়ে বর্তমান বিধায়ক সূর্য অট্টকে বাদ দিয়ে এবারে দল প্রার্থী করেছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পরিষদের সভাধিপতি প্রতিভারানী মাইতিকে। ক্ষুব্ধ সূর্য অট্ট এখনও পর্যন্ত প্রচারে নামেননি। মুখ্যমন্ত্রীর সভাতেও তিনি গরহাজির ছিলেন। এই বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীর নজর এড়িয়ে যায়নি। সেই প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বদল করতে হয়।
অন্যদেরও সুযোগ দিতে হয়। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। নারায়ণগড়ের নির্বাচনী প্রচার থেকে মমতা বলেন, ‘একবার টিকিট পেয়েছি। পরেরবার পেতে পারি, নাও পেতে পারি। কেউ যদি মনে করেন, আজীবন আমি একা থাকব আর কেউ থাকবে না, তা ভুল। টিকিট পাননি বলে এটা নয়, কাল থেকে দলের বিরোধিতা করব। যাঁরা মানুষের সঙ্গে জুড়ে থাকবেন, তাঁরা টিকিট পাবেন।
আর না পেলে তা নিয়ে অসন্তোষের তো কিছু নেই। আমি তো কাউকে অসম্মান করিনি।’ মঞ্চে দাঁতনের প্রার্থী থাকলেও সেখানকার প্রাক্তন বিধায়ক বিক্রম প্রধান ছিলেন না। বিক্রম প্রধানকে শ্রদ্ধা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,’ বিক্রমদাকে খুব শ্রদ্ধা করি। উনি অনেক কাজ করেছেন।বিক্রমদার সঙ্গে আমি কথা বলে নেব। ওনাকে সম্মান ফিরিয়ে দেব। বিক্রমদা আপনার সাহায্য প্রার্থনা করছি।‘
দিল্লির জমিদারদের পরাস্ত করার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বলেন, ‘দিল্লির জমিদারেরা আমার হাত থেকে সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। এটা এক মাস। তার পরে মনে রাখবেন, যতই করো চেষ্টা, মিটবে নাকো তেষ্টা। তৃণমূল আসছে, তৃণমূল আসবে। মানুষ যতক্ষণ থাকবে, জোড়াফুল থাকবে।‘
‘বাংলা মানে আমরা সবাই’— এই বার্তাকে সামনে রেখেই মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী। কুৎসার ফাঁদে পা না দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি। বিজেপি বাংলায় এলে বুলডোজার সংস্কৃতি চালু করার পাশাপাশি মাছ-মাংশ খাওয়া বন্ধ করে দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তৃণমূল নেত্রী। অনলাইনের মাধ্যমে দ্রুত আপিল করার কথা বলেন মমতা। আইনজীবীদের মাধ্যমে আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা বলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।