রাজ্যসভা নির্বাচনে চমক দেওয়া যেন তাঁর রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ। এ বারও তার ব্যতিক্রম হল না। তৃণমূলের প্রার্থিতালিকা ঘোষণার আগে নানা জল্পনা, সম্ভাব্য নামের গুঞ্জন শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তালিকায় এমন কিছু নাম উঠে এসেছে, যা অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত।
তবে এ বারের প্রার্থী বাছাইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। অতীতে সংখ্যালঘু, মহিলা বা আদিবাসী প্রতিনিধিত্বকে গুরুত্ব দিলেও, এ বার তৃণমূলের লক্ষ্য যেন শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ। দলীয় সূত্রে মনে করা হচ্ছে, লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে শহরাঞ্চলে পিছিয়ে পড়ার প্রভাব এই সিদ্ধান্তে পড়েছে। সেই কারণেই চার প্রার্থীই শহুরে, উচ্চশিক্ষিত এবং বহু ভাষায় দক্ষ— যা সরাসরি শহরের ভোটারদের লক্ষ্য করে নেওয়া পদক্ষেপ।
এই তালিকায় অন্যতম চমক অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক। টলিউডের জনপ্রিয় মুখ হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে শহুরে সমাজে। পাশাপাশি তাঁর পারিবারিক পরিচিতি— প্রবীণ অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকের কন্যা হিসেবে তাঁকে আরও পরিচিত করে তুলেছে। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় না থাকলেও, মল্লিক পরিবারের সঙ্গে তৃণমূল নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের।
অন্যদিকে, গায়ক-রাজনীতিক বাবুল সুপ্রিয়কে রাজ্যসভায় পাঠানোও তাৎপর্যপূর্ণ। বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছিলেন। যদিও বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছিল, তবু তাঁকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে না দিয়ে দিল্লির রাজনীতিতে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। অনেকের মতে, তাঁকে দলে ধরে রাখার কৌশল হিসেবেই এই পদক্ষেপ।
আরও একটি বড় চমক প্রাক্তন আইপিএস অফিসার রাজীব কুমারের মনোনয়ন। রাজ্য পুলিশের শীর্ষপদে থাকা অবস্থায় নানা বিতর্কে জড়ালেও, তিনি যে এখনও মুখ্যমন্ত্রীর আস্থাভাজন, এই সিদ্ধান্তে তা স্পষ্ট। অবসরের পর তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও জল্পনা ছিল, যার অবসান ঘটল এই মনোনয়নের মাধ্যমে।
চতুর্থ নাম হিসেবে আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীকে বেছে নেওয়াও কৌশলগত পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে। দিল্লির উচ্চশিক্ষিত ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই তাঁকে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করতে এই ধরনের পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সব মিলিয়ে, এ বারের প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের লক্ষ্য স্পষ্ট— শুধু রাজ্য নয়, শহুরে ও জাতীয় স্তরের রাজনীতিতেও প্রভাব বাড়ানো।