মমতাই বিজেপি-বিরোধী জোটের একমাত্র মুখ

মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লিযাত্রার আগে জাতীয় স্তরের জোট-ঐক্য আরও মজবুত করতে সোমবার বাংলায় আসেন সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব। মঙ্গলবার দুপুরে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা ছিল তাঁর। সেইমতো মঙ্গলবার দুপুর ১টা থেকে দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর জাতীয় রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিলেন উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সমাজবাদী পার্টির সুপ্রিমো অখিলেশ যাদব। মঙ্গলবার দুপুরে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে চলা এই বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বিজেপি ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানান এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করেন।

মঙ্গলবার নবান্নে  মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রায় ৪৫ মিনিট বৈঠক করেন অখিলেশ। এদিন তাঁর সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এসপি নেতা তথা বাম আমলের প্রাক্তন মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দ। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন অখিলেশ যাদব। সেখানে অখিলেশ যাদবের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে–বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

তাঁর কথায়, ‘গোটা দেশে বিজেপির সঙ্গে চোখে চোখ রেখে যিনি লড়াই করতে পারেন, তিনি একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’ তিনি মনে করেন, যে সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিজেপিকে মোকাবিলা করছেন, সেটাই দেশের বিরোধী রাজনীতির পথ দেখাচ্ছে। এই লড়াইয়ের মাধ্যমেই বিজেপিকে পরাস্ত করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন সমাজবাদী পার্টির নেতা। শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে প্রশংসা নয়, এদিন অখিলেশের গলায় প্রচ্ছন্ন হলেও কংগ্রেসও যে বিরোধী দল বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারছেন না তার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।


বিজেপিকে রুখতে তৈরি করা হয়েছিল ইন্ডিয়া জোট। এরপর থেকে সেই জোটে থাকা কংগ্রেসের সোনিয়া ও রাহুলকে বারবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও অভিষেক আঞ্চলিক দলগুলিকে নিয়ে চলার পরামর্শ দেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও জোটে কোনও লাভ হয়নি। মঙ্গলবার সে কথাই স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন যে সোনিয়া কিংবা রাহুল নন, ইন্ডিয়া জোটের মুখপাত্র হতে পারে একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আবার এদিন অখিলেশের আক্রমণের বড় অংশ জুড়ে ছিল রাজ্যে চলা এসআইআর প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে। ১২টি রাজ্যে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া চালাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সেই তালিকায় রয়েছে অখিলেশের রাজ্য উত্তরপ্রদেশও। যেখানে প্রায় তিন কোটি মানুষের নাম বাদ পড়েছে। তবে সমাজবাদী পার্টির প্রধানের দাবি, পশ্চিমবঙ্গকে নিশানা করেই এসআইআর করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ভোটের আগে পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও হেনস্থা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাজ ভোটার সংখ্যা বাড়ানো ও নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্ত করা। অথচ এখানে উল্টো ছবি দেখা যাচ্ছে। এসআইআর-এর নামে মানুষকে ভয় দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। অখিলেশ যাদব সরাসরি এসআইআর প্রক্রিয়াকে এনআরসি-র সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘এটা এনআরসি-র কায়দায় ভোট কাটার চক্রান্ত।’ তাঁর অভিযোগ, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন একযোগে এই কাজ করছে। লক্ষ্য সাধারণ মানুষের উপকার নয়, বরং ভোটার কমানো। তিনি দাবি করেন, উত্তরপ্রদেশেও একই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল।

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়েও সরব হন অখিলেশ। তাঁর বক্তব্য, এসআইআর ও ইডি-র নামে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে যে ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে, তা নজিরবিহীন। তবে আত্মবিশ্বাসের সুরে তিনি বলেন, ‘দিদি ইডি-কে হারিয়ে দিয়েছেন।’ বিজেপিকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘দিদি ইডির থেকে পেনড্রাইভ নিয়ে নিয়েছেন। সেই ‘পেন’ এখনও বিজেপি ভুলতে পারছে না।’

বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ টেনে অখিলেশ যাদব বিজেপির বিরুদ্ধে বিভেদের রাজনীতি করে বলে অভিযোগ তোলেন। তাঁর কথায়, বাংলার শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, সাংস্কৃতিক পরিচয়ও আছে। রবীন্দ্রনাথের গান, ভজন, সৌহার্দ্যের আবহ– এই মাটিতে ঘৃণার রাজনীতি সফল হতে দেবে না। আগামী নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে অখিলেশ বলেন, বিজেপির পরাজয় নিশ্চিত। ব্যঙ্গের সুরে তিনি জানান, বিজেপির লড়াই এখন জেতার জন্য নয়, সম্মানজনকভাবে হারার জন্য। তাঁর মতে, বাংলার মানুষ আবারও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেবে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ও সৌহার্দ্যের রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে।

পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সোমবারেই সস্ত্রীক কলকাতায় এসে পৌঁছেছেন অখিলেশ যাদব। মঙ্গলবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসার আগে কালীঘাটের মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিলেন অখিলেশ, তাঁর স্ত্রী তথা লোকসভার সাংসদ ডিম্পল যাদব এবং তাঁদের সঙ্গে ছিলেন সমাজবাদী পার্টির রাজ্যসভার সাংসদ তথা অভিনেত্রী জয়া বচ্চন। এরপরেই নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক সারেন সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব।