ভোটের মুখে রাজ্যে অশান্তি সৃষ্টির অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

ভোটের মুখে বাংলা জুড়ে অশান্তির পরিবেশ তৈরির চক্রান্ত চলছে বলে সরাসরি অভিযোগ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার নবান্ন সভাঘর থেকে ওয়াটগঞ্জের দইঘাটে নতুন শ্মশানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং নবরূপে নির্মিত সিরিটি মহাশ্মশান-এর ভার্চুয়ালি উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে রাজ্যবাসীর উদ্দেশে শান্তি ও সহাবস্থানের স্পষ্ট বার্তা দিলেন তিনি। কোনও প্ররোচনায় পা না দিয়ে সংযম ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আবেদন জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কেউ কেউ ভোটের আগে অশান্তি লাগানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আমাদের থাকতে হয় ৩৬৫ দিন। এই বাংলা সবার।’

আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই রাজ্যে নির্বাচন। তার আগেই সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টার অভিযোগ তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমি চাই সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে থাকুক। কোনও ঝগড়া, কোনও দাঙ্গা নয়।’ তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘কেউ কেউ দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছে ভোটের জন্য।’ যদিও কারা এই চক্রান্ত করছে, সে বিষয়ে কোনও নাম বা সংগঠনের উল্লেখ করেননি তিনি।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে রাজ্যের সামাজিক গঠনের কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘রাজ্যে ৩০ শতাংশের মতো একটি বড় কমিউনিটি রয়েছে; ২৬ শতাংশ এসসি, ৬ শতাংশ আদিবাসী। কোথাও অশান্তি হলে রাস্তা বন্ধ হবে, রেল অবরোধ হবে, কোম্পানি বন্ধ হবে। এতে সাধারণ মানুষ, শিল্প— সবাই সমস্যায় পড়বে।’ তাই সকলকে শান্ত থাকার, সংযত থাকার এবং একে অপরের বিষয়ে ‘নাক না গলানোর’ পরামর্শ দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।


ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর নির্যাতনের প্রসঙ্গেও এদিন সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাংলায় ভিন রাজ্যের দেড় কোটি শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু এখানে কেউ তাঁদের সমস্যা করে না। অথচ আমাদের শ্রমিকরা যখন বাইরের রাজ্যে কাজ করতে যান, তাঁদের উপর অত্যাচার হচ্ছে।’ এই পরিস্থিতিতে ফের একবার পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলায় ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি তাঁদের জন্য কাজের সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান।

বনধ প্রসঙ্গেও কড়া অবস্থান নেন মুখ্যমন্ত্রী। নবান্ন সভাঘর থেকেই স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমি বনধের বিরোধী। আমি বনধ করতে দেব না।’ তাঁর দাবি, বাম আমলে রাজ্যে ৭৫ লক্ষ কর্মদিবস নষ্ট হয়েছিল। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর একদিনও কর্মদিবস নষ্ট করতে দেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়, ‘এখন বাংলায় আর বনধ হয় না। তাই শিল্পের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’

শিল্পপতিদের উদ্দেশেও সতর্কবার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। জনজাতি ও সংরক্ষিত গোষ্ঠীর দাবিদাওয়া উপেক্ষা করলে তার প্রভাব যে শিল্পের উপরেই পড়তে পারে, সেই বাস্তবতাও তুলে ধরেন মমতা। একই সঙ্গে শিল্পপতিদের আশ্বস্ত করে জানান, রাজ্যে বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। তাঁর দাবি, ‘এখন শিল্পপতিদের গন্তব্য বাংলা। একের পর এক কারখানা হচ্ছে, বহু শিল্প সংস্থা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে।’ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ছ’টি করিডর তৈরির কথাও জানান তিনি।

ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধেও কড়া বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আজ যারা হিন্দু-মুসলমান করছে, আমরা ভারতীয়। এখানে মাইনরিটি আছে, জনজাতি আছে। কেউ কারও বিষয়ে যেন ইন্টারফেয়ার না করে।’ তাঁর কথায়, ‘শান্তি রক্ষা করাই আমার কাজ।’ রাজ্যে সহাবস্থান ও নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, বাংলা শিল্পপতিদের জন্য নিরাপদ জায়গা দেবে।

অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দির নির্মাণ, জগন্নাথ মন্দির, বগলামুখী মন্দির-সহ একাধিক ধর্মীয় পরিকাঠামো উন্নয়নের কথা উল্লেখ করেন তিনি। মমতা বলেন, ‘মন্দির-মসজিদ— যেখানে যেখানে অনুরোধ এসেছে, সেখানে কাজ করা হয়েছে।’

শেষে রাজ্যবাসীর উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘আপনাদের এলাকায় আরও উন্নতির দরকার হলে আমাকে জানাবেন। আমি নিশ্চয়ই করে দেব। আপনারা আমাকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন। আমি সেই কাজ আপনাদের জন্য করেছি। আরও অনেক কাজ হবে। একটু অপেক্ষা করুন।’

ভোটমুখী বাংলায় অশান্তির আশঙ্কার আবহে নবান্ন থেকে মুখ্যমন্ত্রীর এই শান্তির বার্তা এখন রাজ্য রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।