Explainer: গোয়ায় যেটা ৩৭০ টাকা, কর্ণাটকে সেটাই ১,১৪৫! একই দেশে রাজ্য বদলালেই বোতলের দামে এত ফারাক কেন?

Comparison of Alcohol Prices Across States (Image: Pexels/@Ankit Pathak)

গোয়ায় রয়্যাল স্ট্যাগ প্রিমিয়াম (Royal Stag Premium) ৭৫০ মিলিলিটারের বোতল মেলে ৩৭০ টাকায়। কর্ণাটকে সেই বোতলের দাম ১,১৪৫ টাকা। প্রায় তিনগুণ। আর পশ্চিমবঙ্গে সেটাই ৭৮০ টাকা। মানে দ্বিগুণেরও বেশি। কোম্পানি এক, স্বাদ এক, তবু দামের এই তফাত কেন? উত্তর লুকিয়ে আছে রাজ্যের কর কাঠামোয়।

টেবিলে চোখ রাখলেই ধরা পড়ে ফারাক

ছ’টি রাজ্যের তুলনামূলক তালিকায় পাঁচটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ড রয়েছে। তার চারটিতেই সবচেয়ে সস্তা গোয়া। ম্যাকডাওয়েলস নম্বর ওয়ান (McDowell’s No.1) সেখানে ৩৪০ টাকা। মহারাষ্ট্রে সেই বোতলের দাম ৯৪০ টাকা। বাংলায় সেটাই ৬৫০ টাকা। ব্লেন্ডার্স প্রাইড রেয়ার প্রিমিয়াম (Blenders Pride Rare Premium) গোয়ায় ৭০০ টাকা, মহারাষ্ট্রে ১,৫০০ টাকা। বাংলায় ১২০০।  বাকার্ডি হোয়াইট রাম (Bacardi White Rum) গোয়ায় ৭০০ টাকা, মহারাষ্ট্রে ১,৭০০ টাকা আর এই রাজ্যে ৮৬০ টাকা।


দামি স্কচের ক্ষেত্রে অঙ্ক আরও চোখ কপালে তোলে। ট্যামারলেন ব্লেন্ডেড স্কচ হুইস্কি (Tamerlane Blended Scotch Whisky) হরিয়ানায় ১,৩০০ টাকা। বাংলায় ২৩৯০ টাকা। কর্ণাটকে তা ৩,৪২৫ টাকা। ফারাক ২,১২৫ টাকার।

কোনওটাই সবসময় সবচেয়ে দামি নয়

মজার কথা হল, চড়া দামের মুকুট একটি ব্র্যান্ডের মাথায় থাকে না। রয়্যাল স্ট্যাগ আর ট্যামারলেনের সবচেয়ে বেশি দাম কর্ণাটকে। কিন্তু ব্লেন্ডার্স প্রাইড, ম্যাকডাওয়েলস আর বাকার্ডিতে এগিয়ে মহারাষ্ট্র। কেরলমে বাকার্ডি ১,৫৫০ টাকা হলেও রয়্যাল স্ট্যাগ ৮৫০ টাকা। পাশাপাশি দুই রাজ্য দিল্লি আর হরিয়ানাতেও ছবি এক নয়। হরিয়ানায় ব্লেন্ডার্স প্রাইড, রয়্যাল স্ট্যাগ আর ট্যামারলেন সস্তা। কিন্তু ম্যাকডাওয়েলস আর বাকার্ডি সস্তা দিল্লিতে। অর্থাৎ রাজ্য শুধু একটাই করের হার বসায় না। ব্র্যান্ড, দামের স্তর আর মদের ধরন ধরে আলাদা হিসেব কষে। বাংলা সেখানে দামের নিরিখে রাজ্যগুলির বিচারে মাঝের টিয়ারে।

অন্য রাজ্যের নিরিখে বাংলায় মদের দাম মাঝারি টিয়ারে (SNS Graphics)

জিএসটির বাইরেই কেন মদ

২০১৭ সালে দেশজুড়ে পণ্য ও পরিষেবা কর (GST) চালু হয়। কিন্তু মদ ওই ব্যবস্থার বাইরেই রয়ে গিয়েছে। ফলে কর বসানোর ক্ষমতা পুরোপুরি রাজ্যের হাতে। সংবিধানের রাজ্য তালিকা অনুযায়ী মদের উপর আবগারি শুল্ক (Excise Duty) আদায়ের অধিকারও রাজ্যেরই।

আবগারি শুল্ক আর ভ্যাটের দ্বৈত চাপ

মদ তৈরির স্তরে বসে আবগারি শুল্ক। বিক্রির স্তরে বসে মূল্য সংযোজন কর (VAT)। সঙ্গে জুড়ে যায় লাইসেন্স ফি, আমদানি ফি, পরিবহন খরচ আর বিক্রেতার মার্জিন। অনেক রাজ্যে আবগারি দপ্তর এসব হিসেব করে বোতলের দাম অনুমোদন করে। সেটাই হয়ে দাঁড়ায় সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য (MRP)। তাই এক রাজ্যের ভিতরে একই বোতলের দাম সর্বত্র এক।

প্রিমিয়াম ও আমদানি করা ব্র্যান্ডে চাপ আরও বেশি। শুল্ক চড়া হলে চোরাচালানের ঝুঁকিও বাড়ে। সেই ঝুঁকি কমাতেই ২০২১ সালে মহারাষ্ট্র আমদানি করা হুইস্কি, ব্র্যান্ডি, রাম ও ভদকার আবগারি শুল্ক উৎপাদন খরচের ৩০০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫০ শতাংশ করেছিল। রাজ্যগুলি শুল্ক যেমন বাড়ায়, তেমন সুযোগ বুঝে বুঝে কমায়ও।

রাজ্যের কোষাগারের ভরসা

শিল্প সংগঠনের হিসেবে রাজ্যগুলির নিজস্ব রাজস্ব আয়ের ১০ থেকে ২৫ শতাংশ আসে মদ থেকে। মদ জিএসটির আওতায় এলে এই রোজগার কেন্দ্রের সঙ্গে ভাগ করতে হবে। তাই রাজ্যগুলি এতে রাজি নয়। ফলে একক কর কাঠামো আপাতত সুদূরপরাহত।

বাংলার ছবিটা কেমন

২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের আবগারি আয় ছিল ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। রাজ্য সরকার সেই আয় ২০ হাজার কোটি ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। এর আগে এক দফায় বিয়ারের বোতলে ২০ থেকে ২৫ টাকা, বিদেশি মদে (IMFL) ৩০ টাকা ও দিশি মদে ৫ টাকা বেড়েছিল।

২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে বিয়ার বাদে সব ধরনের মদে ২ থেকে ৪ শতাংশ শুল্ক বাড়ে। বিয়ার উৎপাদকদের সংগঠন ব্রুয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (BAI) অনুমান করেছিল, এতে রাজ্যের বাড়তি আয় হতে পারে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা।

বাংলার ক্রেতার কাছে বার্তা পরিষ্কার। দাম বাড়ুক বা কমুক, তার চাবি রাজ্য সরকারের হাতে। অন্য রাজ্যে সস্তা দেখে কিনে আনার চেষ্টাও আইনের চোখে ঝুঁকির। নির্দিষ্ট সীমার বেশি মদ এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে আনা বেআইনি। আপাতত তাই নতুন সরকার মদের কর বাবদ কোনও সংস্কার আনে কি না, তারই দিকে থাকবে নজর।

মদ্যপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। উল্লিখিত দাম সাম্প্রতিক প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংকলিত।