রাত পেরোলেই জন্মাষ্টমী (Janmashtami)। সারা দেশেই এই দিনটি আনন্দের সঙ্গে পালিত হয়। এ বছর ৪ঠা সেপ্টেম্বর অর্থাৎ শুক্রবার জন্মাষ্টমীর(Janmashtami) শুভলগ্ন পড়েছে। হিন্দু শাস্ত্রমতে ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার হলেন শ্রীকৃষ্ণ। ভাদ্র মাসের রোহিণী নক্ষত্রে তাঁর জন্ম হয়েছিল। তাই প্রতি বছর এই দিনটি শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী হিসেবে সারাদেশে সাড়ম্বরে পালিত হয়।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ অনুসারে, মথুরার রাজা কংসের কারাগারে জন্ম নিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। কংস সম্পর্কে ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের মামা। নিজের বোন দেবকী এবং জামাতা বাসুদেবকে কারাগারে বন্দি করে রেখেছিলেন তিনি। দৈববাণী অনুসারে, বোন দেবকীর গর্ভের অষ্টম সন্তানের হাতে মৃত্যু হবে কংসের। এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। এরপর দেবকী এবং বাসুদেবকে কারাগারে বন্দি করে রাখেন।
পুরাণ অনুযায়ী, দেবকীর প্রথম ছয় সন্তানকে হত্যা করেছিলেন কংস। সপ্তম সন্তানের জন্মের আগে দৈববাণী হয় এবং বলরামকে জন্মের আগে বাসুদেবের অপর স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে স্থানান্তরিত করা হয়। এরপরই দেবকীর অষ্টম সন্তান হিসেবে জন্ম নেন শ্রীকৃষ্ণ।
আরও পড়ুন: গিরিশ মহাপাত্রের আড়ালে উত্তমকুমার
মধ্যরাতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মের পর দৈব প্রভাবে কারাগারের সমস্ত প্রহরী ঘুমিয়ে পড়েন এবং কারাগারে দরজা খুলে যায়। সেই সুযোগে বাসুদেব নবজাতক কৃষ্ণকে একটি ঝুড়িতে নিয়ে যমুনা নদী পার হয়ে গোকুলে পৌঁছন। সেখানে নন্দ ও যোশদার কাছে শিশুকৃষ্ণকে রেখে আসেন।
হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস, মধ্যরাত্রি অন্ধকারের শেষ এবং নতুন আলোর আগমনের প্রতীক। কংসের অত্যাচার এবং অশুভ শক্তি বিনাস করে ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্যই শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়েছিল। তাই রাতের অন্ধকারে তাঁর জন্ম আসলে নতুন আলোর বার্তা। এই ভাবনার জন্যই মধ্যরাতে সাধারণত জন্মষ্টমীর পুজোর রীতি প্রচলিত হয়েছে।
তবে এবছর জন্মষ্টমী (Janmashtami) একটু বিশেষ। কারণ এবার রোহিণী নক্ষত্রের বিশেষ যোগ তৈরি হয়েছে। রোহিণী নক্ষত্র হল হিন্দু জ্যোতিষশাস্ত্রে ব্যবহৃত ২৭টি নক্ষত্রপুঞ্জের মধ্যে অন্যতম। আর এই যোগ প্রায় ১৫ বছর পর তৈরি হয়েছে। পঞ্জিকা অনুযায়ী, কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি শুরু হচ্ছে ৪ সেপ্টেম্বর রাত ২টো ২৫ মিনিটে এবং শেষ হচ্ছে ৫ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১৩ মিনিটে।
উদয় তিথির হিসাব অনুযায়ী, ৪ সেপ্টেম্বরই মূল উৎসব পালিত হবে। তবে কিছু বৈষ্ণব সম্প্রদায় এবং নির্দিষ্ট মন্দিরে স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী ৫ সেপ্টেম্বরও জন্মাষ্টমী পালন হতে পারে। নিশীথকালেই মূল পুজো করা হয়। এই সময়েই গোপালের জন্মোৎসব, অভিষেক এবং আরতি করা হয়।
এদিন মথুরা ও বৃন্দাবনের মন্দিরগুলি ফুল ও আলো দিয়ে সেজে ওঠে। ভজন, কীর্তন, রাসলীলা পরিবেশন ও বিশেষ প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে জন্মষ্টমী পালিত হয়। কৃষ্ণের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত গোকুলেও এই উৎসব পালিত হবে।
আরও পড়ুন: ‘অরুণ’ আলোয় অজানা উত্তম
দ্বারকায় এই উৎসব দ্বারকাধীশ মন্দিরকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মধ্যরাতে আরতি, ভক্তিগীতি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মহারাষ্ট্র এবং পশ্চিম ভারতের কিছু অংশে এই উৎসবটি দহি হান্ডির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অন্যান্য অঞ্চলে ভক্তিগীতি, নৃত্য, বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা এবং স্থানীয় মেলার মাধ্যমে পালন করা হয়।
দহি হান্ডি কৃষ্ণের শৈশবের মাখন ও দইয়ের প্রতি ভালোবাসার গল্প থেকে অনুপ্রাণিত। কৃষ্ণ ও তাঁর বন্ধুরা দই-মাখন চুরি করে খেতেন। তাঁদের হাত থেকে সরিয়ে রাখতে উঁচুতে ঝুলিয়ে রাখা হত হাঁড়ি। সেখানে উঠে খেতেন শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর বন্ধুর দল। বর্তমানে মানুষের পিরামিড তৈরি করে হান্ডি ভাঙা হয়। তাই দহি হান্ডি নামে পরিচিত।
তবে মধ্যরাতের জন্মের পরেই এই উদযাপন শেষ হয়ে যায় না। পরের দিনও হয়। তা ‘নন্দোৎসব ‘নামে পরিচিত। যেখানে কৃষ্ণের আগমনের পর নন্দ সম্প্রদায় আনন্দ উদযাপন করে। ব্রজের মতো জায়গায় ভক্তিগীতি, মন্দিরের আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উৎসব চলতে থাকে। জন্মাষ্টমী (Janmashtami) শুধুই একটি মধ্যরাতের আচার-অনুষ্ঠান নয়। মধ্যরাতের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তা শেষ হয়ে যায় না। এটি এমন এক জন্মকাহিনী যা ভারতজুড়ে ভক্তি, সঙ্গীত, উপবাস এবং গোষ্ঠীগত উদযাপনের এক বৃহত্তর সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত।
দেখুন: বিশেষ চেয়ার নয়, সবার সঙ্গে এক আসনে শুভেন্দু, মহানায়কের জন্মশতবর্ষের মঞ্চে ব্যতিক্রমী মুহূর্ত