প্রকৃতির উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই, তবু লড়াই ছাড়ছি না, বর্ষা মোকাবিলায় প্রস্তুত সেচ দপ্তর, দাবি অরূপ দাসের

FB/arupkrdas4BJP

মাত্র দু’মাস আগে রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যেই বর্ষা ঘিরে প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে রাজ্যের সেচমন্ত্রী অরূপ দাসের দাবি, প্রকৃতির উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও পরিস্থিতির কাছে হার মানার প্রশ্ন নেই। বরং জরুরি ভিত্তিতে প্রস্তুতি নিয়ে বর্ষাজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করছে সেচ দফতর।

 সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ— সর্বত্র প্রাক্‌বর্ষা ও বর্ষার সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বাঁধ, খাল, ক্যানেল, নদী ও জলনিকাশির বিভিন্ন পরিকাঠামোর উপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে। কোথাও ক্ষয়ক্ষতি বা বাঁধ ভাঙার খবর মিললেই দ্রুত মেরামতির ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সীমিত রাখা যায়।
মন্ত্রীর অভিযোগ, পূর্বতন সরকারের আমলে সেচ দপ্তর কার্যত উপেক্ষিত ছিল। তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না হওয়ায় বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প মাঝপথে থেমে যায়। নদী সংস্কার, প্রতিরোধমূলক কাজ এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন অবহেলা চলেছে। ফলে নতুন সরকারকে দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমিত সময়ের মধ্যেই জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। এই মুহূর্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের পরিবর্তে মানুষের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে জরুরি কাজকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ডিভিসির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও সরব হন অরূপ দাস। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের সঙ্গে ডিভিসির কার্যকরী যোগাযোগ ছিল না। ফলে কখন জল ছাড়া হবে, সেই বিষয়ে রাজ্য প্রশাসন আগাম তথ্য পেত না। এর জেরে বহু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে অপ্রস্তুত অবস্থায় সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। বর্তমানে নিয়মিত সমন্বয় বৈঠকের মাধ্যমে ডিভিসির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। কত জল ধরে রাখা সম্ভব, কখন জল ছাড়া হতে পারে— সেই বিষয়ে আগাম তথ্য পাওয়ায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হচ্ছে বলে দাবি তাঁর।
শুধু ডিভিসি নয়, প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানান সেচমন্ত্রী। যেসব নদীর উৎস অন্য রাজ্যে, সেই সব রাজ্যের প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে আকস্মিক ভারী বৃষ্টিপাত বা জল ছাড়ার পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গে ইতিমধ্যেই ভারী বর্ষা শুরু হয়েছে। সিকিমেও প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড়ে ধস, কোথাও কোথাও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর মিলেছে। তবু এখনও পর্যন্ত কোনও পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়নি বলে দাবি করেন মন্ত্রী। কোথাও নদীর পাড় ভেঙেছে বা জল ঢুকেছে, সেখানে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কলকাতায় জল জমার প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন অরূপ দাস। তাঁর বক্তব্য, গত বছর একদিনে ৩১০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। এমন অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে কলকাতার ভৌগোলিক অবস্থান এবং দীর্ঘদিনের দুর্বল নিকাশি ব্যবস্থার কারণে জল জমা এড়ানো কঠিন। তবে জল দ্রুত নামানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরগুলির সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ চলছে।
জরুরি পরিস্থিতির জন্য ইতিমধ্যেই শিফটিংয়ের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি। কোথাও ছোট বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত মেরামতির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যেখানে বড় আকারে মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়েছে। কয়েকটি নদীতে জল বিপদসীমার উপর দিয়ে বইলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি মন্ত্রীর।

প্রতি বছর দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় বর্ষাকালে জলবন্দি পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই প্রসঙ্গে অরূপ দাস বলেন, বর্ষার ঠিক আগে বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। আপৎকালীন পরিস্থিতি সামলানোর পাশাপাশি খাল, নালা ও ক্যানেল পরিষ্কারের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।

তাঁর অভিযোগ, বহু ছোট নালা ও খাল দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলের কারণে কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছে। সেগুলি চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।সেচ দপ্তরে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গেও সরব হন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, পূর্বতন সরকারের আমলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। মানুষ সেই কারণেই সরকার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নতুন সরকার স্বচ্ছতা ও দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।


সবশেষে তিনি বলেন, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সঙ্গে সেচ দপ্তরের নিয়মিত সমন্বয় রয়েছে। বর্ষার পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে। প্রকৃতির উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও প্রস্তুতি, সমন্বয় এবং দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার লক্ষ্যেই কাজ করছে রাজ্যের সেচ দফতর।