আরজি কর কাণ্ডে নতুন মোড়, সাজাপ্রাপ্ত সঞ্জয় এবং সন্দেহভাজনদের ফের জেরা করার নির্দেশ হাইকোর্টের

ফাইল চিত্র

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসক ছাত্রীর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় ফের নতুন মোড় এল। এই মামলার শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছে, মামলার তদন্তে তদন্তকারী সংস্থা চাইলে নতুন করে যে কোনও সন্দেহভাজনকে জেরা করতে পারবেন। এছাড়া এই নৃশংস ঘটনা যে একজনের পক্ষে ঘটানো সম্ভব নয় তাও জানিয়েছে আদালত। বৃহস্পতিবার বিচারপতি রাজা শেখর মান্থা ও বিচারপতি রাই চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়।

সেখানে আদালত জানায়, মূল অভিযুক্ত সঞ্জয় রায় অনেক তথ্য জানেন এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে কোনও রকম দ্বিধা রাখা উচিত নয়। যত আধুনিক পদ্ধতি, প্রযুক্তি রয়েছে, তার সব কিছু ব্যবহার করে এই মামলার তদন্ত করা হোক। পরিবারের তরফেও ডিএনএ প্রোফাইল এবং অডিও রেকর্ড আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এসব কিছু ব্যবহার করে সিবিআইকে আগামী ১২ মে-র মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট আদালতে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিন বিচারপতিরা আরও বলেন, বিভিন্ন তথ্য ও রিপোর্ট খতিয়ে দেখে তাঁদেরও মনে হচ্ছে, এই ঘটনায় আরও কারও জড়িত থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আরজি কর হাসপাতালের সেমিনার হল থেকে এক চিকিৎসক ছাত্রীর রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার হয়। অভিযোগ ছিল, তাঁকে ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে। এই ঘটনায় গোটা রাজ্য তথা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রথমে কলকাতা পুলিশ অভিযুক্ত হিসেবে সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে গ্রেপ্তার করে। পরে আদালতের নির্দেশে তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর শিয়ালদহ আদালত সঞ্জয় রায়কে আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। কিন্তু আদালতের এই রায়ে অসন্তুষ্ট ও তদন্তের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন নির্যাতিতার বাবা-মা।


শুরু থেকেই নির্যাতিতার পরিবারের দাবি ছিল, এই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে। শিয়ালদহ আদালত রায় দেওয়ার আগে হাইকোর্টে একটি আবেদন করেছিলেন নির্যাতিতার মা-বাবা। সিবিআই তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলে  হাইকোর্টের বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের বেঞ্চে সেই আবেদন করা হয়। যদিও বিচারপতি ঘোষ সেই সময় নির্যাতিতার পরিবারের ওই আবেদন শুনতে চাননি। কারণ, তখন সুপ্রিম কোর্টেও আরজি কর মামলা চলছিল। এর পরে শীর্ষ আদালতেও একই আবেদন করেন নির্যাতিতার মা-বাবা। তা নিয়ে শুনানিও হয়। কিন্তু একই আবেদন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না জানিয়ে দেন, সুপ্রিম কোর্ট নয়, মামলা শুনবে হাইকোর্টই।

এদিন হাইকোর্টের নয়া পর্যবেক্ষণে মামলাকারীর আইনজীবী জয়ন্ত নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় আদালতে দু’টি অতিরিক্ত হলফনামা জমা দেন। সেখানে চিকিৎসক বিশেষজ্ঞের মতামতও তুলে ধরা হয়, যেখানে ঘটনাটিকে ঘিরে একাধিক অসঙ্গতির ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে বলে জানা যায়। এই প্রেক্ষিতে আদালত সিবিআই-কে আগামী ১২ মে-র মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয়ও সামনে এসেছে। ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, সঞ্জয় রায়ের বেকসুর খালাসের আবেদন এবং সিবিআইয়ের মৃত্যুদণ্ডের দাবি এই দুই বিষয় একসঙ্গেই শুনানি হওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে নির্যাতিতার পরিবারের পুনরায় তদন্তের আবেদনের বিষয়টিও বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানানো হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এতদিন পর্যন্ত মামলাটি মূলত একজন অভিযুক্তকে কেন্দ্র করেই এগোচ্ছিল। কিন্তু আদালতের এই মন্তব্যের ফলে তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ, প্রমাণ সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য অন্য অভিযুক্তদের খোঁজে নামতে পারে সিবিআই।

আরজি কর কাণ্ডে এই নতুন নির্দেশ এবং পর্যবেক্ষণ মামলার ভবিষ্যৎ গতিপথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। নির্যাতিতার পরিবারের দীর্ঘদিনের দাবি ঘটনার পূর্ণ সত্য উদঘাটন, যা এই নির্দেশের ফলে নতুন করে গুরুত্ব পেল। এখন নজর আগামী ১২ মে-র দিকে, সেদিন সিবিআই কী রিপোর্ট জমা দেয়, তার উপরই অনেকটাই নির্ভর করবে এই মামলার পরবর্তী শুনানি কবে হবে।