কলকাতা এবং রাজ্য জুড়ে হকার উচ্ছেদ নিয়ে যে টানাপোড়েন গত দেড় মাস ধরে চলছিল, তাতে এ বার কিছুটা রাশ টানলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। হকার জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটির (Hawkers’ Joint Action Committee) রাজ্য সভাপতিকে তিনি স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছেন, আসন্ন দুর্গাপুজো পর্যন্ত রাজ্যে কোনও হকার উচ্ছেদ অভিযান চলবে না। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এই সিদ্ধান্ত বলে হকার সংগঠনের কাছে জানিয়েছেন তিনি।
কী বললেন মুখ্যমন্ত্রী
সূত্রের খবর, হকার সংগঠনের সঙ্গে সাক্ষাতে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, উৎসবের মরসুমের ঠিক মুখে ব্যাপক আকারে উচ্ছেদ চালানো হলে হাজার হাজার পরিবারের রুজিরুটিতে সরাসরি আঘাত লাগবে। তাই পুজো পর্যন্ত সময়টুকু হকারদের দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহে পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী এবং সচিব হকার সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বসবেন বলেও আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ওই বৈঠকেই দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এবং হকার নিয়ন্ত্রণ নীতি নিয়ে বিস্তারিত রূপরেখা তৈরি হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
রেলের প্রশ্নে কী অবস্থান রাজ্যের
রেলের জমিতে হকার উচ্ছেদের বিষয়টি যে রাজ্য সরকারের এক্তিয়ারের বাইরে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী নিজেই। তবে তা সত্ত্বেও রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সেখানকার উচ্ছেদ অভিযানও পুজো পর্যন্ত স্থগিত রাখার ব্যাপারে সুপারিশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, রেল স্টেশন চত্বরে হকার উচ্ছেদ নিয়ে ইতিমধ্যেই আদালতের হস্তক্ষেপ ঘটেছে। যাদবপুর, ব্রেস ব্রিজ, মথুরাপুর, কোন্নগর, বালিগঞ্জ, বনগাঁ-সহ একাধিক স্টেশনে কলকাতা হাইকোর্ট রেলের জমি থেকে বস্তি ও হকার উচ্ছেদের উপর সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করেছিল, রেল কর্তৃপক্ষকে হলফনামা জমা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। মধ্যমগ্রাম স্টেশনেও সম্প্রতি একই ধরনের অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছে আদালত। কলকাতা পুরসভা এলাকাতেও শিয়ালদহ-সুকান্ত সেতু চত্বর-সহ একাধিক জায়গায় উচ্ছেদ নোটিসের উপর ৯ জুলাই পর্যন্ত মৌখিক অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দিয়েছে হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ।
কী বলছে রাজনৈতিক মহল
গত ৯ মে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পরপরই হাওড়া, শিয়ালদহ, যাদবপুর, দমদম-সহ রাজ্যের নানা প্রান্তে ফুটপাথ ও রেল চত্বর দখলমুক্ত করার কড়া অভিযান শুরু হয়েছিল। ১২ জুন বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে সাংবাদিক বৈঠকেও মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, বেআইনি ভাবে ফুটপাথ দখল করে ব্যবসা চলবে না, উচ্ছেদ চলবেই, তবে পরবর্তীকালে হকারদের পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত করা হবে। কিন্তু বাস্তবে পুনর্বাসনের রূপরেখা স্পষ্ট না হওয়ায় ক্ষোভ ছড়ায় হকারদের মধ্যে। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে শামিল হয় সিআইটিইউ ও অন্যান্য বামপন্থী সংগঠন। বুলডোজ়ার-রাজনীতি বলে তীব্র আক্রমণ শান দেয় বিরোধীপক্ষ। এই প্রেক্ষাপটে আদালতের একের পর এক স্থগিতাদেশ এবং রাস্তার প্রতিবাদ সরকারের উপর যথেষ্ট রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছিল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। পুজোর মরসুম বাংলার শহুরে অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ফলে উৎসবের ঠিক আগে জনরোষ আরও বাড়তে দিতে চাননি মুখ্যমন্ত্রী, এমনটাই ব্যাখ্যা রাজনৈতিক মহলের একাংশের।
নজর বৈঠকের দিকেই
সম্প্রতি রাজ্যে পালাবদলের পরে কলকাতা পুরনিগমে প্রথম বার বসেছিল টাউন ভেন্ডিং কমিটির (Town Vending Committee) বৈঠক। সেখানে হকার জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটির তরফে টাউন ভেন্ডিং কমিটি পুনর্গঠনের দাবি জানানো হয়েছিল, পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হকারদের কাছাকাছি এলাকায় পুনর্বাসনের দাবিও তোলা হয়েছিল। নতুন করে ভেন্ডিং ও নন-ভেন্ডিং জোন চিহ্নিত করতে সমীক্ষা এবং পিএম স্বনিধি ঋণ প্রকল্পে হকারদের অন্তর্ভুক্ত করতে সমীক্ষার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল সেই বৈঠকে। আগামী সপ্তাহের বৈঠকে সেই রূপরেখারই আরও বিস্তারিত রূপ সামনে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।