দীর্ঘ ১৫বছরের একটা সরকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। দীর্ঘদিন তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার থাকায় কলকাতা হাইকোর্টে সহ রাজ্যের জেলা থেকে দায়রা আদালত গুলিতে সরকারি আইনজীবীদের উপস্থিতি নিয়ে কোন সমস্যাই ছিল না। কিন্তু রাজ্যের পালা বদলের পর পরই শুরু হয়েছে সরকারি আইনজীবীদের সংকট। এত দিন ধরে যেসমস্ত সরকারি আইনজীবীরা সরকারের হয়ে আদালতে সওয়াল জবাবের অংশগ্রহণ করতেন আজ তাঁরা ব্রাত্য। কারন তৃণমূল সরকার চলে যাওয়ার পর রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার। তাই তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের আইনজীবীরা তাঁরা বর্তমান সরকারের পক্ষে আদালতে সওয়াল জবাবের অংশগ্রহণ করার অধিকার হারিয়েছে। রাতারাতি বিজেপি সরকারের রাজ্যে চলতে থাকা বিপুল পরিমাণের মামলার জন্য নেই যথেষ্ট আইনজীবী।
রাজ্যের নতুন অ্যাডভোকেট জেনারেল,অতিরিক্ত দুই অ্যাডভোকেট জেনারেলের পাশাপশি সরকারি কৌঁসুলি যাকে পিপি বলা হয় তাঁরা নিয়মিত মামলায় অংশগ্রহণ করছেন ঠিকই কিন্তু সব মামলায় তাঁরা দাঁড়াতে পারেন না। দেওয়ানি মামলা হোক বা ফৌজদারি মামলা, জামিন মামলা থেকে জামিন খারিজের মামলা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিতে সরকারি আইনজীবী অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছেন। অল্প সংখ্যক সরকারি আইনজীবী থাকায় এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ফলে দেরি হচ্ছে শুনানির কাজেও।
গত কয়েকদিন আগেই সেই ছবি ধরা পড়ল বিচারপতির তীর্থঙ্কর ঘোষের এজলাসে এবং বিচারপতি শম্পা সরকারের ডিভিশন বেঞ্চে। বিচারপতি শম্পা সরকারের ডিভিশন বেঞ্চে বর্তমানে আরজি করের মত গুরুত্বপুর্ণ মামলা চলছে। বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের এজলাসে সরকারি আইনজীবী অনুপস্থিত নিয়ে বেজায় চটেছেন তিনি। আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, সন্তোষ দাস ওরফে চিমা বনাম রাজ্য মামলায় কেবলমাত্র আবেদনকারীর আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন না সরকারি আইনজীবী। ফলে এই মামলাটির শুনানিও পিছিয়েছে। রাজ্যের পক্ষ থেকে আইনজীবী বিকাশ সিংহের জন্য আগেই সময় চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত আদালতের কাজ শুরু হওয়ার এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তিনি কোথায় আছেন, সে বিষয়ে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর কোনো তথ্য দিতে পারেননি। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ হন বিচারপতি নিজেই।
এই পরিস্থিতিতে বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের মন্তব্য, রাজ্য সরকারের প্যানেলে থাকা কিছু আইনজীবী আদালতে হাজিরা দেওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দেখাচ্ছেন না। তাই লিগ্যাল রিমেমব্রান্সার, রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, কি কি মানদণ্ডের ভিত্তিতে এসব আইনজীবীকে নিয়োগ করা হয়েছে, সে বিষয়ে একটি রিপোর্ট কলকাতা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে জমা দিতে হবে।
সন্তোষ দাস ওরফে চিমা বনাম রাজ্য মামলার জামিনের আবেদনটি ১২ জুন ২০২৬ তারিখে দায়ের করা হয়েছিল। মামলাটি একদিন অন্তর অন্তর ডাকা হলেও, পাঁচবার ডাক পড়ার পরও রাজ্যের পক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করার ব্যাপারে কোনো আন্তরিকতা দেখা যায়নি বলে আদালত তার রায়ে উল্লেখ করেছে।আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে,লিগ্যাল রিমেমব্রান্সারের রিপোর্ট ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে হাইকোর্টে জমা দিতে হবে।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে বিচারপতি শম্পা সরকারের ডিভিশন বেঞ্চে। সেখানেও সরকারি আইনজীবী না থাকায় বিলম্ব হচ্ছে শুনানি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। দেখা যাচ্ছে যে, সরকারি আইনজীবীর কাছে দুবার নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তার পরেও তিনি অনুপস্থিত।তবে, অতিরিক্ত সরকারি আইনজীবী আদালতের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে জানান যে, বর্তমান অসহায় পরিস্থিতির কারণে এখনও কোনো আইনজীবীকে এই মামলার দায়িত্ব প্রদান করতে পারেননি।
অতিরিক্ত সরকারি কৌঁশলি জানিয়েছেন, ‘আমাদের জানানো হয়েছে যে, মাননীয় সরকারি আইনজীবীর কার্যালয় বর্তমানে কার্যকর অবস্থায় নেই। ফলে প্রতিদিনই বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা অনুরোধ করছি যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যথায়, আমরা বাধ্য হব রাজ্য সরকারের পক্ষের আইনজীবীর অনুপস্থিতিতেই মামলার শুনানি এগিয়ে নিয়ে যেতে।‘
বিষয়টা বিচারপতি শম্পা সরকার ও বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ শুধু নয়, বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের এজলাসেও সরকারি আইনজীবী উপস্থিতি নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। সে সময় অন্য একটি মামলা কারণে বিচারপতি রাওয়ের এজলাসে উপস্থিত অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি সুস্মিতা সাহা দত্ত তিনি বিচারপতিকে জানান, সরকারি আইনজীবী সমস্যার সমাধান প্রক্রিয়া চালু হয়ে গিয়েছে। আগামীতে সরকারি আইনজীবী অনুপস্থিতি সমস্যার থাকবে না।