আনন্দপুরের নাজিরাবাদে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে মোমো তৈরির কারখানা ও গুদাম। এই ঘটনায় মৃতদের পরিবার পিছু ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। একথা জানিয়েছেন পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। দেহ বা দেহাংশের শনাক্তকরণ হলেই পরিবারের হাতে চেক তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বুধবার ডিএনও পরীক্ষার জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চাওয়া হবে।
ফিরহাদ হাকিম বলেন, ‘মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার পরই আর্থিক সাহায্য করা হবে। দুঃখজনক ঘটনা। অনেকজন মানুষ মারা গিয়েছেন। দমকল ও পুলিশ তদন্ত করছে। যে দেহগুলি পাওয়া গিয়েছে, তা ফরেন্সিকে পাঠানো হয়েছে। সেগুলি শনাক্ত করা যায়নি। নিখোঁজ অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।‘
ডিএনএ পরীক্ষা করতে গেলে নিয়ম মেনে আদালতের কাছে অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি পাওয়ার পর নমুনা পরীক্ষা করা যায়। বুধবার পুলিশ সেই অনুমতি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হবে বলে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে এই ঘটনায় দু’টি মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
রবিবার রাত দেড়টা নাগাদ গুদামে আগুন লাগে। দমকলের ১২ ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু হয়। পরে আরও ৪টি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে যায়। অবশেষে দেড় দিন পর দমকলের ১৬টি ইঞ্জিনের তৎপরতায় মঙ্গলবার আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। এখনও পর্যন্ত সরকারি মতে ৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা গিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। মঙ্গলবার নাজিরাবাদের পোড়া গুদাম থেকে ৮ জনের দেহাংশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে খবর।
নিখোঁজ ১৫ জনের অধিক। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ১৪ জনের পরিবারের তরফে নিখোঁজ অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।তমলুকের বাসিন্দা রাজু মান্নার পরিবার নরেন্দ্রপুর থানায় নিখোঁজের অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি ডেকোরেশনের কাজ করতেন। ২৫ তারিখ রাত ১০টা নাগাদ শেষ বারের মতো তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছিল। ২৬ তারিখ সকালে থেকে তাঁকে আর ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না, ফোন বন্ধ।
এই ঘটনায় গুদামের মালিক গঙ্গাধর দাসকে আটক করেছে নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশ। গুদামের মালিকের বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরে। বাড়ি থেকেই অভিযুক্তকে ধরেছে পুলিশ। বারুইপুরে জেলা পুলিশ দপ্তরে আনা হয়েছে গঙ্গাধর দাসকে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তাঁকে। গ্রেপ্তারের পর বুধবার তাঁকে আদালতে পেশ করা হবে বলে খবর।
নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশের একটি দল মেদিনীপুরে যায়। গঙ্গাধর দাসের বাড়ি থেকেই তাঁকে আটক করে। যদিও গুদাম মালিক পুরো দায় চাপিয়েছেন মোমো সংস্থার ঘাড়েই। সূত্রের খবর, যে জমিতে গুদাম, সেই পুরো জমির মালিক ছিলেন গঙ্গাধর। মোমো কোম্পানি গুদাম লিজে নিয়েছিল। ওই গুদামেই ঘটনার দিন কাজ করছিলেন শ্রমিকরা।
গুদাম মালিকের বিরুদ্ধে একাধিক গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে। যে গুদামে এতগুলো শ্রমিক কাজ করতেন সেখানে ছিল না অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র। নেই বাইরে বেরনোর পথ। নরেন্দ্রপুর থানায় অভিযুক্তর বিরুদ্ধে দমকলের তরফে গাফিলতির অভিযোগ দায়ের করা হবে বলে খবর। এরপরই এই মামলায় গঙ্গাধর দাসকে অফিসিয়ালি গ্রেপ্তার দেখানো হবে।
মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থল যান দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দমকল বিভাগের ডিজি রণবীর কুমার। কারখানার কোনও অনুমোদন ছিল না বলে জানিয়েছেন দমকলের ডিজি। সেই কথাই কার্যত স্বীকার করে নেন দমকলমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘প্রচুর জায়গায় প্রচুর কারখানা রয়েছে। অনেকে লাইসেন্স নিয়ে করছেন, অনেকে বেআইনিভাবে করছেন। এখনই বলতে পারব না, ওদের কাছে কী কাগজপত্র ছিল। যদি বেআইনিভাবে হয়ে থাকে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।‘
ঘটনার দেড়দিন পর কারখানার সুপারভাইজার ঘটনাস্থলে হাজির হন। তিনি সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘এখানে বেআইনি কিছু হচ্ছিল না।‘ দমকলের ডিজি জানিয়েছিলেন অনুমতি ছাড়া কারখানা চলছিল। সেই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কোনও জবাব দিতে পারেননি কারখানার সুপারভাইজার।