মমতার উপর ভরসা রেখে ভোট দেবেন প্রাক্তন মাওবাদী নেত্রী

মাথায় ঝুড়ি ভরে মহুল ফুল নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন লক্ষ্মী সর্দার। ক্লান্ত শরীরে ছোট্ট মাটির দাওয়ায় গা হেলিয়ে একটু বিশ্রাম নেন তিনি। দশ ফুট বাই দশ ফুটের মাটির ঘরই তাঁর সমস্ত পৃথিবী। শুকনো মহুল ফুল বিক্রি করে কেজি প্রতি সামান্য আয়—মাত্র পঁয়ত্রিশ টাকা। অল্প উপার্জন, সঙ্গে সরকারি ভাতা ও খাদ্যসাথী প্রকল্পের রেশনে কোনও মতে চলে তাঁর সংসার। তবে আজ তাঁর জীবনে নতুন আলো—বহু প্রতীক্ষার পর জেল থেকে মুক্ত হয়ে ঘরে ফিরেছেন তাঁর মেয়ে, প্রাক্তন মাওবাদী নেত্রী শোভা সিং সর্দার।

দীর্ঘদিন বুকের কষ্ট চেপে মেয়ের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন লক্ষ্মী। এখন মা-মেয়ে একসঙ্গে নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ির মাজুগোড়া গ্রামের এক সাধারণ কিশোরী শোভা, অল্প বয়সেই কঠিন বাস্তবতার চাপে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হন। তারপর মাওবাদী স্কোয়াডে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন পরিচিত মুখ—শোভা থেকে হয়ে ওঠে চন্দনা সিং। প্রায় পাঁচ বছর স্কোয়াডে থাকার পর ২০১০ সালে গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর দীর্ঘ পনেরো বছর সংশোধনাগারে কাটিয়ে গত বছরের জুলাইয়ে জামিনে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসেন নিজের গ্রামে।

এখন ৩৩ বছর বয়সি শোভার কণ্ঠে স্পষ্ট আক্ষেপ। হারিয়ে যাওয়া শৈশব, কৈশোর আর পড়াশোনার সুযোগ—সবকিছুই তাঁকে নাড়া দেয়। তবে একই সঙ্গে তিনি দেখছেন বদলে যাওয়া জঙ্গলমহল। একসময় যেখানে রাস্তা, পানীয় জল, স্কুল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অভাব ছিল, আজ সেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া স্পষ্ট। শিশুদের সাইকেলে চেপে স্কুলে যাওয়া, সরকারি সহায়তায় পড়াশোনা—এই পরিবর্তন তাঁকে আশাবাদী করেছে।


বর্তমান সরকারের নানা প্রকল্প নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেন শোভা। বিশেষ করে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প মহিলাদের আর্থিক স্বনির্ভরতায় সাহায্য করছে বলে মনে করেন তিনি। ‘যুবসাথী’ প্রকল্পকেও ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। নানা অভাব-অভিযোগের মধ্যেও লক্ষ্মীর ভরসা বর্তমান রাজ্য সরকারের উপরেই। একই বিশ্বাস মেয়ে শোভারও। আর তাই তিনি এবার ভোটে  অংশ নিতে  তবে নিজের জীবনের স্থিতির জন্য তাঁর আবেদন-সরকার যেন তাঁকে একটি বসবাসযোগ্য ঘর দেয় এবং একটি চাকরির ব্যবস্থা করে।

তাঁর কথায়, ‘মায়ের বয়স হয়েছে, চিকিৎসার প্রয়োজন। নিজের জীবনটাও চালাতে একটা কাজ দরকার।‘ মহুল ফুল শুকোতে দিতে দিতে লক্ষ্মী সর্দারের কথায় স্পষ্ট ভরসা—মমতার উপরই তাঁদের নির্ভরতা। বহু ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে শোভাও এখন একটাই স্বপ্ন দেখেন—খোলা আকাশের নিচে শান্ত, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা।