রবিবার চেতলার অহীন্দ্র মঞ্চ থেকে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুর থেকে মুখ্যমন্ত্রীকে ৬০ হাজারের বেশি ভোটে জেতানোর লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে দেন। সেই লক্ষ্যকে ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন কলকাতার মেয়র তথা মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। এরপর থেকেই ভবানীপুরে মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছেন তিনি।
আসন্ন বিধাসভা ভোটে ভবানীপুর কেন্দ্রকে ‘পাখির চোখ’ করেছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। ‘দিদির জিতই আমার জিৎ। আর আমি হারতে শিখিনি’ এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে ভবানীপুরের অলিতে গলিতে প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। নিজের কেন্দ্র কলকাতা বন্দরের চেয়েও এখন ভবানীপুরে বেশি সময় দিচ্ছেন ফিরহাদ হাকিম। দলনেত্রীর জয়ের ব্যবধান বাড়াতে তিনি যে কতটা মরিয়া, তা তাঁর প্রচারের ধরন থেকেই স্পষ্ট।
ভবানীপুর বিধানসভার অন্তর্গত ৭৪,৭৭, ৭৮ ,৮২ নম্বর ওয়ার্ড চেতলা এলাকায় ফিরহাদ হাকিমই ‘শেষ কথা’। হাতের তালুর মতোন চেনেন তিনি। রবিবারের বৈঠক থেকে মুখ্যমন্ত্রী কর্মীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। ‘লোডশেডিং’ নিয়েও সাবধান করে দেন। এ নিয়ে ফিরহাদ হাকিমকে প্রশ্ন করা হলে, তাঁর সাফ কথা, এখানে তৃণমূলের শক্ত সংগঠন রয়েছে, তৃণমূলের বিশ্বস্ত সৈনিকেরা এখান জান-প্রাণ দিয়ে কাজ করছেন।
তাছাড়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম, কর্ম সব এই বিধানসভাতেই বলে জানান তিনি। তাই ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেও তিনি মনে করছেন। মুখ্যমন্ত্রী আগেরবারের থেকে আরও বেশি ভোটে যাতে জিততে পারেন, সেই চেষ্টাই করা হ্চ্ছে।ফিরহাদের বক্তব্য, ‘আমি আমার বিধানসভা এলাকার জন্য প্রচুর কাজ করেছি। আমি কোনও সময়ই আমার এলাকার ভোটারদের কাছে ভোট চাইতে যাই না। আমি একটাই কথা বলি, আমার থেকে আরও ভালো যদি কোনও প্রার্থী পান, তাকেই ভোট দেবেন।
কিন্তু মানুষ ভালোবেসে আমাকেই ভোট দেন।‘ বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণে রাজনীতি নিয়ে ফিরহাদকে প্রশ্ন করা হলে, তিনি বলেন, ‘সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপর নাই। আমি শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের বাণীকেই নিজের পাথেও ভাবি। কারণ তিনিই তো বলে গিয়েছেন, যত মত তত পথ। তাই গুজরাত থেকে আসা কিছু ব্যক্তি, আমাদের হিন্দুত্ব নিয়ে, ধর্ম নিয়ে শেখাবে সেটা আমরা শিখব না।‘ ফিরহাদের কথায়, ‘আশা করা ভালো, সাহস থাকাও ভালো। কিন্তু দুঃসাহস করা ভালো নয়। এটা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেব, চৈতন্য মহাপ্রভুর মাটি। এখানে সাম্প্রদায়ীকতা আর ভেদাভেদের রাজনীতি চলে না। আর বিজেপির মনোভাবের সঙ্গে বাঙালির মনোভাব কোনওভাবেই মেলে না।‘
সেই সঙ্গে ভবানীপুরের ভোটার তালিকায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ফিরহাদ। বিরোধীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে অতিরিক্ত ভোটার তালিকা ঘিরে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।ফিরহাদের অভিযোগ, বহু ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বা ‘বিবেচনাধীন’ অবস্থায় রাখা হয়েছে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ফিরহাদের বক্তব্য, কোন ভিত্তিতে নাম বাদ যাচ্ছে বা যুক্ত হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে না। এই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়াকে তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন এবং কমিশনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
৬৭ বছর বয়সেও সমান তালে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন ফিরহাদ হাকিম। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তিনি এখনও নিজেকে পুরোপুরি ফিট বলেই দাবি করেন। প্রতিদিন সকালে সাধারণ খাবার খেয়েই তিনি প্রচারে বেরিয়ে পড়েন। তাঁর কথায়, রাজনীতিকদের সক্রিয় থাকতে হয়, বয়স তাদের থামাতে পারে না।সব মিলিয়ে, ভবানীপুরে বড় জয় নিশ্চিত করতে তৃণমূলের জোরদার প্রচার চালাচ্ছে। আর সেই লড়াইয়ের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন ফিরহাদ হাকিম।