মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের একশোর বেশি সদস্য ভোটার তালিকা থেকে নাম ‘মুছে’ যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই পরিবারের হাত ধরে ৩০০ বছর আগে বাংলা, বিহার ও ওড়িশা অঞ্চল সমৃদ্ধ হয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ব্রিটিশদের সাহায্যে মসনদে বসেছিলেন মীরজাফর। বর্তমানে পরিবারের ১৫তম বংশধর মহম্মদ রেজা আলি মির্জা, যিনি ‘ছোটে নবাব’ নামে পরিচিত, মুর্শিদাবাদের ‘কিল্লা নিজামত’ এলাকায় পরিবারসহ বসবাস করছেন। ১৬তম বংশধর সৈয়দ মহম্মদ ফাহিম মির্জা তার বাবার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকেন।
নবাব পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, এসআইআরের ফলে তাদের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে। ফাহিম আলি মির্জা জানান, লালবাগের নব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২১ নম্বর বুথে প্রায় ৮৫০ ভোটারের মধ্যে ২৮৬ জনের নাম বাদ গিয়েছে, যাদের বেশিরভাগই নবাব পরিবারের। বাদ পড়াদের মধ্যে রয়েছেন ফাহিম নিজে, তাঁর বাবা, স্ত্রী, জ্যাঠা মহম্মদ আব্বাস আলি মির্জার দুই মেয়ে ও বড় ছেলে।
তাঁরা আদৌ আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে এখন সন্ধিহান নবাব পরিবারের সদস্যদের। এসআইআরের ‘শুনানি’র নোটিস পেয়ে নবাব বংশের সদস্যরা সব নথি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সামনে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু শুনানির পরেও পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের নাম স্থায়ীভাবে তালিকা থেকে ‘বাতিল’ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
ফাহিম বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারি প্রাসাদসহ বহু স্থাপত্য তৈরি করেছিলেন। অথচ ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নাম কেটে ভারতীয় নাগরিকত্বই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পর মুর্শিদাবাদ তিনদিন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু আমাদের পরিবারের হস্তক্ষেপে এটি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টও জ্যাঠা আব্বাস আলি মির্জাকে নবাব পরিবারের বংশধর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এই প্রমাণের চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে যে আমরা ভারতের নাগরিক?’
তিনি আরও জানান, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বাবার নাম ছিল ‘মহম্মদ রেজা আলি মির্জা’ এবং তাঁর নাম ছিল ‘সৈয়দ ফাহিম মির্জা’। যদিও নাম সংশোধন করার পর এবার এসআইআরে তাদের নাম ‘বিবেচনাধীন’ হয়েছিল। ৮২ বছর বয়সি তাঁর বাবা অসুস্থ থাকলেও সমস্ত নথি নিয়ে নিজে লাইনে দাঁড়িয়ে জমা দিয়েছেন। তবুও পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের নাম স্থায়ীভাবে বাদ হয়েছে।
নবাব পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আবার আবেদন করবেন। তবে শুনানি প্রক্রিয়ায় সময় লাগার কারণে এবছর তাঁরা ভোট দিতে পারবেন না। মুর্শিদাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রের বিদায়ী বিজেপি বিধায়ক গৌরিশঙ্কর ঘোষ বলেন, ‘যদি কারও নাম বাদ যায়, তারা ফর্ম-৬ পূরণ করে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন।‘ পরিবারটি এই পরিস্থিতিতে মর্মাহত, কারণ প্রজাদের বিচার করতেন পূর্বপুরুষরা, আর এখন তাঁদের ‘নাগরিকত্বের বিচার’ করতে হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। মীরজাফরের বংশধদের ইতিহাস ও আইনের সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নাগরিকত্ব প্রমাণে মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যার ফলে মুর্শিদাবাদে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।