ফের এসআইআর নোটিস পেয়ে একাধিক জেলার মৃত্যু, অসুস্থ মগরাহাটের এইআরও

প্রতীকী চিত্র

অক্টোবর মাসের শেষ দিকে বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। তার পর থেকেই রাজ্যে একাধিক মৃত্যুর খবর সামনে আসতে থাকে। এনুমারেশন ফর্ম বিলির সময় একাধিক সাধারণ মানুষের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। সেই সঙ্গে এসআইআর কাজের সঙ্গে যুক্ত বিএলও-দেরও মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতে থাকে। ফর্ম পূরণের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর শুরু হয় শুনানি পর্ব।

শুনানি পর্বেও আতঙ্কে একাধিক মৃত্যু হওয়ার অভিযোগ উঠছে। শুনানিতে নথিপত্র দেখাতে না পেরে দেশ ছাড়া হওয়ার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন অনেকে। সেই সঙ্গে রয়েছে বয়স্কদের শুনানিতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার যন্ত্রণা। এদিন এসআইআর আতঙ্কে তিন জেলা থেকে মৃত্যুর খবর মিলেছে। দক্ষিণের দুই জেলা দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুরে যেমন মৃত্যু ঘটেছে তেমনি উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারেও ঘটেছে মৃত্যু।

এসআইআর নোটিস হাতে পেয়ে মৃত্যু হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলপিতে। মৃত মহিলার নাম খালেদা বিবি। বয়স ৫০ বছর। বৃহস্পতিবার তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে খবর। তাঁর চার পুত্রের নামে শুনানির জন্য নোটিস আসে। এসআইআর-এর নোটিস নিয়ে মানসিক চাপ থেকেই অসুস্থ হয়ে মৃত্যু বলে দাবি পরিবারের। বৌমা আজমিরা বিবি বলেন, ‘নোটিস আসায় উনি ভয় পাচ্ছিলেন, সবাই যদি আলাদা হয়ে যাই। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বুধবার আমরা বাড়িতে ছিলাম না, সেই সময়ে এই ঘটনা ঘটে।’


কুলপির করঞ্জলী এলাকায় থাকতেন খালেদা বিবি। তাঁর চার সন্তান রয়েছে। কিছু দিন আগেই তাঁর সন্তানদের নামে এসআইআর-এর শুনানির নোটিস আসে। নির্দিষ্ট দিনে কাগজপত্র, নথি নিয়ে শুনানিকেন্দ্রে হাজিরা দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল নোটিসে। সেই নোটিস হাতে পাওয়ার পর থেকেই পুত্রদের নিয়ে বৃদ্ধা চিন্তায় ভুগছিলেন বলে দাবি পরিবারের। মানসিক চাপে অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে দাবি পরিবারের। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরিবারের সদস্যেরা তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকেরা তাঁকে পরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃত্যুর কারণ জানতে দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

খালেদার মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর বাড়ি যান কুলপি ব্লক তৃণমূল সভাপতি সুপ্রিয় হালদার। এই মৃত্যুর জন্য তিনি একযোগ নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপিকে দায়ী করেছেন। কুলপির ব্লক তৃণমূল সভাপতির কথায়, ‘দুঃখজনক ঘটনা। একাধিক বার শুনানিতে ডাকলে আতঙ্ক তো ছড়াবেই। স্বাভাবিক ভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, কেন আমাকে বার বার ডাকা হচ্ছে?  সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট ধারণা নেই। নির্বাচন কমিশনার মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। আমরা চেষ্টা করছি যথাসাধ্য বোঝানোর। বিজেপির দালালি করছে কমিশনার।’

অন্যদিকে পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির দেশপ্রাণ ব্লকের বসন্তিয়ার মক্তব পূর্ব বুথের বাসিন্দা সামসুন বিবির পরিবারের তিন সদস্য শুনানির নোটিস পেয়েছে। দুই ছেলে, এক মেয়ে। তাঁরা ঠিকমতো নথি দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে চিন্তায় ছিলেন। পরিবারের দাবি, মানসিক চাপেই হার্ট অ্যাটাক হয়, মৃত্যু হয় সামসুনের। পরিবারের দাবি, ভোটার তালিকায় ছেলে মেয়ের নাম থাকবে কি না, সেই চিন্তায় প্রাণ গেল তাঁর।

শুধু দক্ষিণে নয়, উত্তরেও শুনানির ডাক পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছেন এক প্রৌঢ়। অবশ্য শুনানিতে তিনি ডাক পাননি। ডাক পেয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। দেশছাড়া হওয়ার ভয় জাঁকিয়ে বসেছিল প্রৌঢ়ের মনে। আর সেই ভয় থেকেই চরম সিদ্ধান্ত। বাড়ির অদূরে বাগান থেকে উদ্ধার হয় প্রৌঢ়ের গলায় ফাঁস দেওয়া দেহ। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে আতঙ্কেই আত্মঘাতী হয়েছেন তিনি। দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠিয়েছে পুলিশ। এরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা।

মৃত প্রৌঢ়ের নাম চান্দু সরকার। উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারের পরিরাজপুর পঞ্চায়েতের মুরালিপুকুরের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। পেশায় পরিযায়ী শ্রমিক। এসআইআর শুনানিতে ডাক পেয়েছিলেন চান্দুর স্ত্রী। তারপর থেকেই আতঙ্কে ভুগছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর স্ত্রীর হাজিরা দেওয়ার কথা ছিল। সকালে শুনানিতে যাওয়ার জন্য তৈরিও হন তিনি। তারপর দেখেন স্বামী নেই। খোঁজাখুজির পর বাড়ির অদূরে বাগানের গাছে দেখেন স্বামীর ঝুলন্ত দেহ। পুলিশ গিয়ে দেহ উদ্ধার করে।

এই ঘটনার জেরে এলাকা অশান্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়রা বিক্ষোভ দেখাতে থাকে। তার জেরে বন্ধ হয়ে যায় ইটাহার হাইস্কুলের শুনানি। মৃতদেহ নিয়ে ইটাহার চৌরাস্তা আটকে বিক্ষোভ দেখান স্থানীয়রা।  ঘটনাস্থলে যান স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক মোশারফ হোসেন। বিশাল পুলিশবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মৃতের বাবা মোবারক হোসেন বলেন, বউমা জিন্নাতুন বিবির শুনানির জন্য আজ যাওয়ার কথা ছিল। সকাল থেকে চান্দুকে বাড়িতে না দেখতে পেয়ে খোঁজ করে। তখনই বাগানে চান্দুর দেহ দেখতে পাই। ও ভয় পাচ্ছিল, কিন্তু এমনটা হবে ভাবতে পারিনি।‘

মৃত্যুর মতো ঘটনার পাশাপাশি এদিন এসআইআর শুনানির দায়িত্বে থাকা এক এইআরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে খবর। তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটের দায়িত্বে ছিলেন। ওই এইআরও-র নাম জিন্নাত আমান খাতুন। শুনানি কেন্দ্রেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। টানা কাজ ও অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে দাবি ওই এইআরও-র সহকর্মীদের। অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে তাঁকে বানেশ্বর গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁকে ডায়মন্ড হারবার মেডিক্যাল হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা। বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন এইআরও জিন্নাত।