মার্চ মাসেই দেওয়া হবে মহার্ঘ ভাতা, ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।  তিনি জানিয়েছেন, চলতি মাস অর্থাৎ মার্চ থেকেই বকেয়া ডিএ দেওয়া শুরু হবে। রবিবার নির্বাচন কমিশনের ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার ঠিক আগেই ডিএ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী।

রবিবার বিকেল ৩টা ৫ মিনিট নাগাদ সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে ডিএ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমাদের মা-মাটি-মানুষের সরকার তার সকল কর্মচারী, পেনশনভোগী, লক্ষ লক্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অশিক্ষক কর্মচারী, পঞ্চায়েত ও পুরসভার কর্মী এবং পেনশনভোগীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে। তাঁরা রোপা–২০০৯ অনুযায়ী বকেয়া ডিএ ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকেই পেতে শুরু করবেন।‘ পাশাপাশি তিনি জানান, কীভাবে এবং কোন পদ্ধতিতে এই বকেয়া অর্থ প্রদান করা হবে, সে বিষয়ে রাজ্য সরকারের অর্থ দপ্তর ইতিমধ্যেই একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।

উল্লেখ্য, রাজ্য সরকারকে বকেয়া ডিএ মেটানোর নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিমি কোর্ট। বকেয়া ডিএ-র অন্তত ২৫ শতাংশ অবিলম্বে কর্মচারীদের দিতে বলা হয়। বাকি অর্থ কীভাবে ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে, তা নির্ধারণের জন্য প্রাক্তন বিচারপতিদের নিয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। যদিও রাজ্য সরকার এই অর্থ মেটাতে কিছুটা সময় চেয়ে আদালতে আবেদন করেছিল এবং সেই মামলার শুনানি এখনও বাকি রয়েছে।


পশ্চিমবঙ্গে বকেয়া ডিএ নিয়ে আন্দোলন নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি কর্মচারীরা এই দাবি করছেন। ২০০৯ সালের বেতন কাঠামো বা রোপা–২০০৯ অনুযায়ী বকেয়া ডিএ দেওয়ার দাবিতে রাজ্যের বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন নিয়মিত আন্দোলন করে এসেছে। তাঁদের অন্যতম দাবি ছিল, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের মতো একই হারে ডিএ প্রদান করতে হবে।

২০২২ সালে রাজ্য সরকারকে বকেয়া ডিএ মেটানোর নির্দেশ দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছিল, সরকারি কর্মচারীদের প্রাপ্য এই ভাতা আটকে রাখা যায় না এবং তা নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী প্রদান করতে হবে।

তবে সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্ট যায় । শীর্ষ আদালত রাজ্য সরকারকে বকেয়া ডিএ-র অন্তত ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। সেই অর্থ পরিশোধের জন্য আদালত রাজ্যকে ছয় সপ্তাহ সময়ও বেঁধে দেয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজ্য সরকার সেই বকেয়া ডিএ পরিশোধ করতে পারেনি।

বরং রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টের কাছে অতিরিক্ত ছয় মাস সময় চাওয়া হয়। মামলার শুনানি দীর্ঘদিন ধরে চলার পর অবশেষে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সেই শুনানি শেষ হয়। পরে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেয় শীর্ষ আদালত।

সেদিন বিচারপতি সঞ্জয় করোল ও বিচারপতি মনোজ মিশ্রের বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, মহার্ঘ ভাতা কোনও দয়া বা অনুদান নয়, এটি সরকারি কর্মচারীদের আইনি অধিকার। তাই বকেয়া ডিএ রাজ্য সরকারকে দিতেই হবে। আদালত নির্দেশ দেয়, বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ দু’দফায় মিটিয়ে দিতে হবে। আদালত  মে মাসের মধ্যেই দুই কিস্তিতে এই বকেয়া অর্থ মেটানোর নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে প্রথম কিস্তির অর্থ অবশ্যই ৩১ মার্চের মধ্যে প্রদান করতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ পরিশোধের পর যে অর্থ বাকি থাকবে, তার কতটা অংশ কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে দেওয়া হবে, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রার নেতৃত্বাধীন একটি কমিটিকে। এই কমিটি পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে বাকি অর্থ প্রদানের রূপরেখা নির্ধারণ করবে বলে জানানো হয়েছে।

তবে সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা তাঁদের প্রাপ্য ডিএ হাতে পাননি। এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের তরফে আদালতে জানানো হয়, বকেয়া ডিএ পরিশোধের আগে বিপুল সংখ্যক কর্মচারীর নথি যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারের দাবি অনুযায়ী, প্রায় ৩ লক্ষ ১৭ হাজারেরও বেশি কর্মীর তথ্য খতিয়ে দেখতে হবে।

রাজ্যের বক্তব্য, ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত অধিকাংশ সরকারি কর্মীর তথ্য ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষিত ছিল না। সেই সময় কর্মীদের পরিষেবা সংক্রান্ত তথ্য মূলত হাতে লেখা সার্ভিস বুকের আকারে সংরক্ষিত থাকত। ফলে বকেয়া ডিএ নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে গেলে সেই সব নথি প্রথমে ডিজিটাইজ করা প্রয়োজন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় অর্থ পরিশোধে দেরি হচ্ছে বলে রাজ্য সরকারের তরফে আদালতে জানানো হয়।

এর পাশাপাশি রাজ্য সরকার আরও একটি সমস্যার কথাও তুলে ধরে। তাদের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে বর্তমানে প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত অনেক আধিকারিক অন্য দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় প্রশাসনিক কর্মীসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে গিয়েছে। ফলে ডিএ সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ নথি যাচাই এবং ডিজিটাইজ করার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এই প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা উল্লেখ করে বকেয়া ডিএ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর আর্জিও জানানো হয় আদালতের কাছে।

রাজ্য সরকারের এই অবস্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করে সরকারি কর্মচারীদের সংগঠনগুলি। তাদের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ডিএ প্রদানে বিলম্ব করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ আন্দোলনের পথে হাঁটে এবং শুক্রবার ধর্মঘটের ডাক দেয়। যদিও সেই ধর্মঘট তেমন বড় আকারে সফল হয়নি বলে জানা যায়।

এরই মধ্যে রবিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ চলতি মাসেই সরকারি কর্মচারীদের দেওয়া হবে। এই ঘোষণার ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা ডিএ আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবিপূরণ হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে কর্মচারী মহলের একাংশ এখনও অপেক্ষা করছে— ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ কবে এবং কীভাবে শুরু হয়, তা এখন দেখার।