গঙ্গা ভাঙনে সব গিয়েছে জলে। চাষের জমি থেকে শুরু করে মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই গ্রামবাসীদের। সর্বস্ব গ্রাস করেছে গঙ্গা তার ভাঙনের জেরে। এক কাপড়ে কাতারে কাতারে মানুষ জীবন বাঁচাতে পৈতৃক ভিটে ছেড়ে এখন রাস্তায়। খোলা আকাশের নীচে হাপিত্যেশ করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। অবশেষে আশ্রয় হয়েছে ত্রাণশিবিরে। একটু চিঁড়ে-গুড়ের আশায় ডিঙি বেয়ে সকলেই খুঁজছেন নিরাপদ আশ্রয়। ভুতনিতে গঙ্গার ভয়াবহতা এমন পরিস্থিতিই তৈরি করেছে। মুহুর্তের মধ্যে ভুতনির মানচিত্রটা যেন বদলে গিয়েছে। সামনেই দুর্গাপুজো। কিন্তু ওঁদের কাছে পৌঁছয়নি উৎসবের আমেজ। এই আবহে ‘ত্রাতা’ হয়ে পৌঁছলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আর এখান থেকেই বানভাসি মালদহে দুর্গতদের জন্য ২৪২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেন তিনি।
এদিকে প্লাবিত ও নদী ভাঙন বিধ্বস্ত মালদহ পরিদর্শন করে বিপুল অঙ্কের আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে রাজ্যের সমস্ত মাদ্রাসা এবং বিদ্যালয়ে পঠনপাঠন শুরুর আগে পূর্ণাঙ্গ ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার উপর জোর দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, যাঁরা এটি পরিবেশন করবেন, তাঁরাই তাঁর বন্ধু। বৃহস্পতিবার হেলিকপ্টারে চেপে মালদহের প্লাবিত অঞ্চলগুলি আকাশপথে ঘুরে দেখেন মুখ্যমন্ত্রী। আর মানিকচকের সভায় দুর্গত মানুষের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, ‘বন্যায় পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত ২৪,৫৯৫টি পরিবারকে বাড়ি মেরামতির জন্য ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ২২,৩৪০টি পরিবারকে ৯০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। দুর্গাপুজোর মুখেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজার পরিবারকে নতুন পোশাক, ত্রিপল, মশারি এবং পাঁচদিনের খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হচ্ছে।’
অন্যদিকে হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ না করে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার টাকা পেয়েছেন প্রত্যেক ‘যোগ্য’রা। তথ্য দিয়ে বিধানসভা নির্বাচনের সময় তৃণমূলের মিথ্যা প্রচারকে বিঁধে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের বলেছিল না, বিজেপি ক্ষমতায় আসলে দ্বিতীয় কিস্তির টাকা মিলবে না। আমরা হিন্দু-মুসলিম বেছে দিইনি। যাঁরা ঘর করেছেন তাঁদের সকলকে টাকা দিয়েছি। বানভাসী পরিস্থিতিতে ২১টি সরকারি ত্রাণশিবির এবং ২৫টি কমিউনিটি কিচেনের মাধ্যমে প্রত্যেকদিন অন্তত ৮,১০০ জন মানুষকে রান্না করা খাবার জোগানো হচ্ছে এবং গবাদি পশুদের খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা হয়েছে।’ আকাশপথে যাত্রার সময় ভয়াবহতা মোবাইলে ক্যামেরাবন্দি করেন শুভেন্দু অধিকারী। মালদহের মানিকচকে পৌঁছে দুর্গতদের উদ্দেশে সহানুভূতি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, ‘এই যন্ত্রণা থেকে স্থায়ী মুক্তি অঙ্গীকার দিয়ে যাব। রতুয়া, মানিকচক, ইংরেজবাজারের দুরাবস্থার স্থায়ী সমাধান হবে।’
তাছাড়া গঙ্গা ও ফুলহার নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, আইআইটি কানপুরকে দিয়ে ডিপিআর তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের ভূতনি, রতুয়া, বৈষ্ণবনগর, সামশেরগঞ্জ ও লালগোলার মতো এলাকার স্থায়ী সুরক্ষার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ৩,৩০০ কোটি টাকার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। যার মধ্যে চলতি অর্থবর্ষেই ৫০০ কোটি টাকা অনুমোদন মিলেছে। সেন্ট্রাল ক্যালামিটি রিলিফ ফান্ড থেকে ১,৭০০ কোটি টাকা হস্তান্তরের আশ্বাস মিলেছে। ১২৫ দিনের গ্রামীণ কাজের মাধ্যমে পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ ত্বরান্বিত করা হবে। শুভেন্দু অধিকারীর কথায়, ‘গত ৫০ বছর ধরে কোনও সরকার আপনাদের জন্য ভাবেনি। আপনাদের জলে পড়ে থাকতে দেব না। শুধু ভাষণ দিয়ে কাজ শেষ নয়। কাজের কাজ হবে। আমরা প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ মতো কথা কম, কাজ বেশিতে বিশ্বাসী। আর যাঁরা অন্য উপায়ে ঘর পেয়েছেন তাঁদের টাকা ফেরত দিতে হবে। জেলেও যেতে হবে। ভাববেন না পাঁচ মাস পেরিয়ে গিয়েছে, ভুলে গিয়েছি। জেলের ভিতরে ঢোকাব। আপনাদের থেকে দুটি জিনিস চাইব। ১৮ বছরের আগে কোনও বোনের বিয়ে দেবেন না তো? ১২-১৪ বছরের মেয়েগুলি মা হচ্ছে। সমাজসংস্কার করতে হবে। ধর্ম পরিবর্তন করবেন না।’