৮ লক্ষ কোটির দেনার বোঝা সামলেও বাংলায় ‘পরিবহন বিপ্লব’! নতুন বাস উদ্বোধনে বড় পরিকল্পনা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী

Image: SNS

মাত্র নয় সপ্তাহ আগে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দিয়েছিল নতুন সরকার। মঙ্গলবার  সেই প্রতিশ্রুতিরই বড় রূপরেখা তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পরিবহন ভবনে ৪৩টি সিএনজি ও ৭টি পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাসের উদ্বোধন করে তিনি জানিয়ে দিলেন, পশ্চিমবঙ্গের পরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। শুধু সড়ক পরিবহন নয়, রেল, জলপথ এবং বিমান পরিষেবাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে আগামী দিনে রাজ্যের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পূর্ত ও জনস্বাস্থ্য কারিগরি মন্ত্রী অজয় পোদ্দার, পরিবহনমন্ত্রী অর্জুন সিং, মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল, পরিবহন সচিব রবীন্দর সিং, পরিবহন ও অর্থ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মন,  পশ্চিমবঙ্গ পরিবহন নিগম, উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন নিগম এবং দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন নিগমের শীর্ষ আধিকারিকরা। তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কোনও রাজ্যের অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত, আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য হয়। উন্নত পরিবহন ব্যবস্থাই শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের পথকে আরও প্রসারিত করে।
নিজের বক্তব্যে আগের সরকারের রেখে যাওয়া আর্থিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, সিপিআইএম এবং তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্যের উপর প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা চাপানো হয়েছে। সেই পরিস্থিতি সামলেই বর্তমান সরকার উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতের রাজনীতি না করে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করাই রাজ্যের উন্নয়নের জন্য বেশি ফলপ্রসূ হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নিতিন গড়কড়ির উদ্যোগে দেশের পরিকাঠামো  উন্নয়নের যে গতি তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গকেও যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের ৬০:৪০ আর্থিক অংশীদারিত্বের প্রকল্পের আওতায় রাজ্যে সিএনজি ও বৈদ্যুতিক বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি কলকাতা, উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন ডিপোতে চার্জিং স্টেশন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলেও জানান তিনি। মহিলাদের জন্য চালু হওয়া বিনামূল্যের বাস পরিষেবাকে আরও কার্যকর করতে নতুন ‘পিঙ্ক কার্ড’ চালুর কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী।

যে সব কর্মজীবী বা উচ্চ আয়ের মহিলা বিনামূল্যের পরিবর্তে নিয়মিত টিকিট ব্যবহার করতে চান, তাঁদের সুবিধার জন্য এই বিশেষ কার্ড চালু করা হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা চালক ও কন্ডাক্টরদের বেতনের বৈষম্য দূর করার সিদ্ধান্তও ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী আগস্ট মাস থেকেই কন্ডাক্টরদের বেতন চালকদের সমপর্যায়ে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

শুধু বাস পরিষেবাতেই নয়, জলপথেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ভারতের ১৭তম রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে ‘ওয়াটার মেট্রো’ পরিষেবা চালুর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গার্ডেনরিচ থেকে হাওড়ার সাঁকরাইল-শিবপুর পর্যন্ত পণ্যবাহী যানবাহনের জন্য ‘রো-রো’ পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কোনা এক্সপ্রেসওয়ের উপর যানজট অনেকটাই কমবে বলে আশা করছে সরকার।
শহুরে গণপরিবহন ব্যবস্থাকেও আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্গাপুর-আসানসোল এবং শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি— এই দুই জোড়া শহরের মধ্যে রাজ্য পরিচালিত ‘সিটি মেট্রো’ চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে এডিবি, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক অথবা হাডকোর সহযোগিতায় বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট (ডিপিআর) তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মুখ্যসচিবকে।
বিমান পরিবহন ক্ষেত্রেও একাধিক বড় পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, উত্তর ২৪ পরগনার কল্যাণীতে প্রায় ২,০০০ একর জমিতে একটি নতুন গ্রীনফিল্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি বালুরঘাট, মালদা ও পুরুলিয়ায় অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর নির্মাণের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত হয়েছে বলে তিনি জানান।
নতুন উদ্বোধন হওয়া বাসগুলির রঙ নিয়েও বিশেষ বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, স্বামী বিবেকানন্দ এবং প্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে নতুন বাসগুলিকে গেরুয়া বা ‘স্যাফরন’ রঙে সাজানো হয়েছে। এটি শুধুমাত্র একটি রঙের পরিবর্তন নয়, বাংলার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
পরিবহন পরিষেবাকে আরও শক্তিশালী করতে আগামী মার্চ ২০২৭-এর মধ্যে এক হাজার নতুন বাস রাস্তায় নামানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে প্রথম দফায় ৪০০ বাস কেনার জন্য অবিলম্বে টেন্ডার ডাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অতীতের সরকারগুলির আমলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে বারবার ‘না’ শোনা গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের লক্ষ্য প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। তাঁর কথায়, ডাবল ইঞ্জিন সরকারের হাত ধরে পশ্চিমবঙ্গে এবার উন্নয়নের গতি আরও বাড়বে এবং পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
পরিবহনমন্ত্রী অর্জুন সিং বলেন, রাজ্যের পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের ভিত্তি অনেক আগেই তৈরি হয়েছিল, যখন শুভেন্দু অধিকারী পরিবহন মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময়েই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নানা কারণে সেই উদ্যোগগুলির গতি থেমে যায় এবং পরিবহন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন সরকার সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে পরিষেবা স্বাভাবিক করতে কাজ শুরু করেছে। তাঁর দাবি, খুব শীঘ্রই বাস পরিষেবায় আর কোনও বড় সমস্যা থাকবে না এবং সাধারণ মানুষ আরও উন্নত পরিষেবা পাবেন।
ট্রাম পরিষেবা নিয়েও বড় ইঙ্গিত দেন পরিবহনমন্ত্রী। তিনি জানান, আগের সরকারের সময় যে ট্রাম রুটগুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে সেগুলির পুনরুজ্জীবনের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণেশ্বর, কালীঘাট এবং নিউ টাউনের মতো এলাকায় নতুন করে ট্রাম পরিষেবা চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর কথায়, রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী এই গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক রূপে ফিরিয়ে আনতে সরকারের একাধিক পরিকল্পনা রয়েছে।