২৭২ কোটি টাকার জলঢাকা রেল প্রকল্পে অনুমোদন দিল কেন্দ্র

Ashwini Vaishnav Raju Bista Photo-SNS

উত্তরবঙ্গের কৌশলগত সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং ডুয়ার্সের পাহাড়ি এলাকার আর্থ-সামাজিক চিত্র বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিল কেন্দ্র সরকার। ভারত-চীন-ভুটান ত্রিদেশীয় সংবেদনশীল সীমান্তের দিকে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন খুনিয়া মোড়-জলঢাকা রেলপথ নির্মাণের জন্য ২৭২ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে রেল মন্ত্রক। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশনের অধীনে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। সম্প্রতি এই সিদ্ধান্তর কথা জানাম দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা।

প্রস্তাবিত এই রেললাইনটি আলিপুরদুয়ার ডিভিশনের চালসার কাছে খুনিয়া মোড় থেকে শুরু হয়ে জলপাইগুড়ি ও কালিম্পং বন বিভাগের পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা, যেমন— চাপড়ামারি বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য, শিপচু, কুমানি ও নকশাল অঞ্চলের পাশ দিয়ে জলঢাকা পর্যন্ত পৌঁছবে। পরিবেশগত সংবেদনশীলতার কথা মাথায় রেখে বর্ষার মরশুম শেষ হলেই ভারতীয় রেল এবং পশ্চিমবঙ্গ বন দফতর যৌথভাবে প্রস্তাবিত রুটের অ্যালাইনমেন্ট সমীক্ষা বা সার্ভে শুরু করবে। যেহেতু পথটি বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে যাবে, তাই চূড়ান্ত নির্মাণকাজ শুরুর আগে কেন্দ্র ও রাজ্যের পরিবেশ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সমস্ত আইনি ছাড়পত্র নেওয়া হবে। প্রকল্পের বিশদ তথ্য বিবরণী বা ডিপিআর তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই এগিয়ে চলেছে।

এই নতুন রেল প্রকল্প চালসা থেকে সীমান্তমুখী প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি দীর্ঘমেয়াদি ও দূরদর্শী কৌশলগত রেলপথের প্রাথমিক অংশ, যা ডোকলাম লাগোয়া জুলুক পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সিকিমের জেলেপ লা গিরিপথ সংলগ্ন কুপুপ বা বিটাং হ্রদ এলাকা থেকে জলঢাকা নদীর উৎপত্তি, যা ২০১৭ সালের বহুল চর্চিত ডোকলাম স্ট্যান্ডঅফের স্থান থেকে অত্যন্ত কাছে। সীমান্তে চীনের ক্রমাগত পরিকাঠামোগত সক্রিয়তার জবাবে প্রয়োজনে ভারতীয় সেনা, ভারী সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ দ্রুত দুর্গম সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে দিতে এই পথটি প্রতিরক্ষা খাতে গেমচেঞ্জার প্রমাণিত হতে চলেছে। পাশাপাশি নির্মীয়মাণ সেবক–রংপো রেললাইনকেও ভবিষ্যতে নাথু লা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার ফলে জলঢাকা প্রকল্পটির মাধ্যমে গ্যাংটকে পৌঁছানোর একটি বিকল্প রুটও তৈরি হবে।


কৌশলগত ও সামরিক সুরক্ষার পাশাপাশি এই রেলপথ ডুয়ার্স ও আশেপাশের পাহাড়ি অঞ্চলের পর্যটন শিল্পে বিরাট জোয়ার আনবে। ডুয়ার্সের পাহাড় ও নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক আসেন, কিন্তু এতদিন রেল যোগাযোগ না থাকায় শুধুমাত্র আঁকাবাঁকা সড়কপথই ছিল একমাত্র ভরসা। এই রেলপথ চালু হলে জলঢাকা–ঝালং–বিন্দু সার্কিটে যাতায়াত অত্যন্ত সহজ ও আনন্দদায়ক হবে। পাশাপাশি অফবিট পাহাড়ি গ্রাম টোডে ও তাংটার পর্যটন মানচিত্রে আলাদা গুরুত্ব তৈরি হবে। এর ফলে স্থানীয় হোমস্টে ব্যবসা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং কৃষিজ ও বনজ পণ্য পরিবহণে বড় ধরণের অর্থনৈতিক লাভ নিশ্চিত হবে। পাহাড়ি অঞ্চলের কঠিন ভূপ্রকৃতির কারণে সেবক-রংপো প্রকল্পে বেশ কয়েকটি সুরঙ্গ তৈরি করতে হলেও, খুনিয়া মোড় থেকে গৌরীবাস পর্যন্ত বেশিরভাগ অংশ সমতল হওয়ায় এই প্রকল্পের কাজ অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন রেল আধিকারিকরা।

আঞ্চলিক পরিকাঠামো উন্নয়নে এই অভূতপূর্ব অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা অঞ্চলের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। যৌথ সমীক্ষা ও বন দফতরের পরিবেশগত ছাড়পত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেই দ্রুত গতিতে প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হয়ে যাবে।