কোচবিহার জেলার কোতোয়ালিপুর থানার অন্তর্গত ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফিরোজা বেগম দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত। বর্তমানে তাঁর চিকিৎসা চলছে। তিনি দেওচড়াই জুনিয়র বেসিক প্রাইমারি স্কুলের একজন সহকারী শিক্ষিকা। তাঁর স্বামী রুহুল আমিন। পরিবারে বাবা-মা ও চার বোন রয়েছেন। অভিযোগ, বাবা-মা এবং তিন বোনের নাম এসআইআর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ফিরোজা বেগমের নাম বাদ পড়ে যায়।
কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী ফিরদৌস শামীম জানান, ফিরোজা বেগম এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করেছিলেন এবং নাগরিকত্ব ও পরিচয় সংক্রান্ত সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছিলেন। তিনি ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ পরিচালিত চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। সেই সংক্রান্ত নথিপত্রও তিনি দাখিল করেছিলেন।
আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২৪ জানুয়ারি ২০১১ সালে ফিরোজা বেগম দেওচড়াই জুনিয়র বেসিক প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ হন। এরপর থেকে তিনি দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নামের বানান নিয়ে বিভ্রান্তি। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ভুলবশত ‘ফিরোজা বেগম’-এর পরিবর্তে ‘ফিরোদা বেগম’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। পরে টাকাগাছ রাজাহাট গ্রাম পঞ্চায়েত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রদত্ত শংসাপত্রে নিশ্চিত করে যে ‘ফিরোদা বেগম’ এবং ‘ফিরোজা বেগম’ একই ব্যক্তি। এছাড়া ১৯৯৮ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার মার্কশিটে তাঁর নাম ‘ফিরোজা বেগম’ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, যা তাঁর দাবিকে আরও শক্তিশালী করে।
বিষয়টি জানতে পেরে তিনি ২০০৩ সালেই ভোটার তালিকায় নাম সংশোধনের উদ্যোগ নেন এবং পরবর্তীতে তাঁর পিক কার্ডেও সঠিক নাম ফিরোজা বেগম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ফিরোজা বেগমের দাবি, একজন সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও বেআইনিভাবে ভোটার তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে ২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ট্রাইব্যুনাল তাঁর আবেদন খারিজ করে দেয়। এতে শুধু তাঁর ভোটাধিকারই ক্ষুণ্ণ হয়নি বরং তাঁর চাকরি ও কর্মজীবনের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আইনজীবী ফিরদৌস শামীম হাইকোর্টে আরও জানান, ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ডেকেছিল ঠিকই কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়নি। কেন তাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তারও কোনও নির্দিষ্ট কারণ দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ। আবেদনকারীর পক্ষে ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে পারিবারিক ও নথিগত সম্পর্কের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। পাশাপাশি একাধিক সরকারি পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি এবং অন্যান্য সরকারি দলিল তাঁর পরিচয় ও নাগরিকত্বের দাবিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
বর্তমানে সারা রাজ্যে প্রায় ৩৪ লক্ষ আবেদন ট্রাইব্যুনালে ঝুলে রয়েছে। কবে সেগুলির নিষ্পত্তি হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে বহু মানুষ অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যদিও কলকাতা হাইকোর্টের শিক্ষক, চিকিৎসক, অধ্যাপক-সহ সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মামলার দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছিল। উল্লেখ্য, কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে অধ্যাপক কাজী তাজউদ্দিনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল দ্রুত শুনানি করে তাঁর মামলা নিষ্পত্তি করেছিল। একইভাবে, রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে ফারাক্কার কংগ্রেস প্রার্থী মহতাব শেখের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ট্রাইব্যুনাল দ্রুত শুনানি করে তাঁর নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করে। পরবর্তীতে তিনি বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হন।
এদিকে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি রাওয়ের নির্দেশে ফিরোজা বেগমকে আগামী ২৫ জুন বিএলও অথবা নির্বাচন আধিকারিকের কাছে সমস্ত নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই দিনই মামলার শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সমস্ত নথি যাচাই-বাছাইয়ের পর তাঁর নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় কি না।