রাজ্যের অনান্য অঞ্চলের পাশাপাশি শহর বর্ধমানে অবৈধ নির্মাণ ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হল। আর এ নিয়ে শহর জুড়ে আলোড়ন ছড়িয়ে পড়েছে। পৌর এলাকায় এতদিন যে সমস্ত বেআইনি নির্মাণ হয়েছে সেগুলো একের পর এক ভেঙে ফেলার কাজ চলবে বলে জানানো হল। এর মধ্যে শপিং মল থেকে শুরু করে ফ্ল্যাট বা বহুতল আবাসন সবই এর আওতায় পড়বে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, শুধু বর্ধমান নয়, এবার থেকে গুসকরা, কালনা, কাটোয়ার মতো পৌর শহরগুলিতেও অভিযান শুরু হবে। অবৈধ নির্মাণের অভিযোগ এলেই আধিকারিকদের কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেন জেলাশাসক শ্বেতা আগরওয়াল। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথমে অবৈধভাবে নির্মাণকারীদের নোটিস দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। সাতদিনের সময়সীমা দেওয়া হচ্ছে। তা না হলে পৌরসভার পক্ষ থেকে বুলডোজার নিয়ে হাজির হয়ে অবৈধ নির্মাণ ভেঙে ফেলা হবে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, কাটোয়া এবং কালনার কয়েকটি নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রভাবশালীদের মদতে পুকুর ভরাট করে নির্মাণ হয়েছে। সেগুলি নিয়েও তদন্ত করা হচ্ছে। পুরসভার আধিকারিকদের সমস্ত নথি খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। এছাড়া আমজনতাও নির্দিষ্টভাবে অবৈধ নির্মাণ নিয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন। আধিকারিকরা তা খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ নেবেন। এরই মধ্যে শহর বর্ধমানের বিভিন্ন ওয়ার্ডে একাধিক বেআইনি নির্মাণ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন । তৃনমূল সরকারের আমলে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বানিজ্যিক কেন্দ্র, বহুতল আবাসন বেআইনিভাবে হয়েছে বলে অভিযোগ আগেই উঠেছিল। কিন্তু তৃনমূল পরিচালিত পৌরবোর্ড নানা অজুহাতে সেসব ভেঙে না ফেলে টালবাহানা চালিয়েছে।
পালা বদলের পর সরকারি নির্দেশ মেনে সেগুলো এবার প্রশাসনিক নজরে আনা হয়েছে। সবচেয়ে মারাত্মক অভিযোগ নিয়ম বর্হিভূতভাবে ১০ থেকে ১২ তলা আবাসন, বানিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। বীরহাটা এলাকায় একটি মাত্র বহুতল আবাসনের দুটি ফ্লোর ভেঙে ফেলার নির্দেশ ছাড়া আর কোন আবাসন নিয়ে পৌরসভা কোন পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানা গেছে। তৃনমূল বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, ব্যাঙের ছাতার মতো অবৈধ নির্মাণ হয়েছে এ শহরে। এমনকি শহরে গড়ে উঠা একাধিক বেআইনি নির্মাণে এলাকারই প্রাক্তন বিধায়ক এবং তারই পরিবার পরিজনের আংশিক মালিকানা আছে , এ নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।
এমনকি এক শ্রেণীর কাউন্সিলররা অবৈধ কাজে বৈধতা দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা তোলাবাজি করে আয় করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। বীরহাটা ছাড়াও বড়বাজার, পার্কাসরোড মোড়, রাধানগর তেমাথা, পুলিশ লাইন বাজার, বিসি রোড ফলপট্টি এলাকায় বহুতল আবাসন নিয়ে অভিযোগ একাধিক। এরই মধ্যে তেজগঞ্জ এলাকায় একটি অবৈধ নির্মাণ বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হলো। বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই নির্মাণ চলছিল। ভোটের আগেই অভিযোগ জানানো হলেও পৌরসভা কোন পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ। তার পরেই নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এদিন ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হলো।
এদিকে অভিযোগ বর্ধমানের মতো কাটোয়া শহরেও অবৈধ নির্মাণকারীদের সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। কয়েকজন প্রভাবশালী বেনামে নির্মাণ কাজে মোটা টাকা বিনিয়োগ করেছেন। পুরসভায় তাঁদের যথেষ্ট দাপট ছিল। এতদিন তাঁদের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস দেখাতেন না। ওই প্রভাবশালীরা নির্মাণ করতে নিয়মের তোয়াক্কা করেছিল কি না, সেটা আধিকারিকরা খতিয়ে দেখবেন। কালনার এক প্রভাবশালীর মদতে পুকুর ভরাট করে অবৈধ নির্মাণ হয়েছিল বলে বহুদিন ধরে চর্চা রয়েছে।
সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। এক আধিকারিক বলেন, শুধু শহর নয়, পঞ্চায়েত এলাকাতেও অবৈধ নির্মাণ ভাঙা হবে। সরকারি জায়গা যাঁরা জবর দখল করে দোতলা বাড়ি তৈরি করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেওয়ার কাজ চলছে। সরকারি হিসাবে শুধুমাত্র বর্ধমান শহরেই প্রায় ১৫০ টির মতো অবৈধ নির্মাণ রয়েছে। এর মধ্যে ৩০ জন নির্মাণকারীকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। সামনের সপ্তাহের মধ্যে আরও কয়েকটি অবৈধ নির্মাণ ভাঙা হবে।
শহরের বাসিন্দাদের ক্ষোভ , গত দু বছরে নির্মাণ কাজে বর্ধমানে অনিয়মটাই নিয়ম হয়ে উঠেছিল। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই বহুতল তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শহরে একের পর এক পুকুর ভরাট হলেও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পৌর কর্তৃপক্ষ নাম কা ওয়াস্তে কয়েকটি ভরাট হওয়া পুকুর থেকে মাটি তুললেও কড়া পদক্ষেপ নেয়নি। তাতে অবৈধ নির্মাণকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তবে বর্ধমান দক্ষিণের নব নির্বাচিত বিধায়ক মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র বলেন, কয়েক দিন আগেই পুরসভায় গিয়ে বৈঠক করেছি। কোনো ধরনের অনিয়ম করা চলবে না বলে সতর্ক করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের আর এক আধিকারিক বলেন, বর্ধমান শহর লাগোয়া পঞ্চায়েত এলাকাতেও কয়েটি নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সেগুলিও নিয়ম মেনে হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবৈধ নির্মাণ ভাঙার পাশাপাশি নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে দীর্ঘ দিন পর হলেও বেআইনি নির্মাণ নিয়ে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে শহরবাসীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।