নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে নতুন বিতর্ক। কমিশনের চিঠিতে বিজেপির সিল নিয়ে শুরু হয়েছে জোর তরজা। অভিযোগ, কমিশনে নথিতে বিজেপির প্রতীক-সহ সিলমোহর দেখা গিয়েছে। ঘটনাটি সামনে আসতেই বিরোধী মহল সরব হয়েছে। বিজেপির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আঁতাতের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই সরব হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।এই ঘটনা সেই অভিযোগকে মান্যতা দিল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
ঘটনা নিয়ে এক্স হ্যান্ডলে সরব হয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কমিশনকে এক হাত নিয়ে অভিযেক মঙ্গলবার এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে লিখেছেন, ‘এই কারণেই বিচারব্যবস্থার কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে খর্ব করা হয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের প্যানেল থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনটা চলতে থাকলে আর খুব বেশি দেরি নেই, যখন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রাজনীতির ছাপ থাকবে।’
প্রকাশ্যে আসা চিঠিটি ২০১৯ সালের একটি নির্দেশিকা সংক্রান্ত বলে জানা গিয়েছে, যা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সিপিএমের কেরল শাখার তরফে। সেই নথির শেষাংশে বিজেপির প্রতীক-সহ সিলমোহরের উপস্থিতি ঘিরেই বিতর্কের সূত্রপাত। বিরোধীদের দাবি, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে না এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রভাবেই পরিচালিত হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, কমিশন কার্যত বিজেপির ‘বি-টিম’ হিসেবে কাজ করছে। একই সুরে সরব হয়েছেন দলের সাংসদ মহুয়া মৈত্র। তিনি সামাজিক মাধ্যম এক্সে কটাক্ষ করে লেখেন, কমিশন অবশেষে এমন একটি চিঠি জারি করার ‘সাহস’ দেখিয়েছে, যা বহুদিনের অভিযোগকে যেন প্রকাশ্যে স্বীকার করে নেওয়ার সামিল। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট রাজনৈতিক ব্যঙ্গ—গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিতর্কের মুখে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। কমিশনের দাবি, গোটা ঘটনাটি নিছকই একটি ‘ক্লারিক্যাল এরর’ বা করণিক ত্রুটি। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সম্প্রতি ভারতীয় জনতা পার্টির কেরল শাখা ২০১৯ সালের প্রার্থীদের অপরাধমূলক রেকর্ড সংক্রান্ত একটি পুরনো নির্দেশিকা জানতে চেয়ে আবেদন করে। সেই আবেদনের সঙ্গে যে নথির অনুলিপি জমা দেওয়া হয়েছিল, তাতেই বিজেপির নিজস্ব সিলমোহর আগে থেকেই ছিল।
কমিশনের দাবি, যথাযথ নজরদারির অভাবে সেই সিলযুক্ত কপিটিই ভুলবশত অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাছেও পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, এটি কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং প্রশাসনিক স্তরের অসাবধানতার ফল—এমনটাই জানানো হয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় বিরোধী মহল। তাদের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি ‘ভুল’ হিসেবে দেখিয়ে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এমন ত্রুটি স্বাভাবিক নয় বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের। পুরনো চিঠি হলেও, তাতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সিল থাকা অবস্থায় সেটি সরকারি ভাবে প্রচারিত হওয়া প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহ রয়েছে, এবং এই ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও জোরদার করেছে। ফলে কমিশন ‘কেরানির ভুল’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও, কীভাবে এমন ত্রুটি ঘটল, তার স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা এখনো রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রেই রয়ে গেছে। নির্বাচন যত এগোচ্ছে, ততই এই ধরনের ঘটনা কমিশনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে সংশয় বাড়াচ্ছে।